পর্ব-৪
মেয়েটি হঠাৎ থেমে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকালো।
কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করেই থেমে গেল। এতক্ষণ যে মেয়েটির পিছু নিয়ে হাঁটছিল, এখন সে নিজেই তার দিকে এগিয়ে আসছে।
প্রতিটি পদক্ষেপ যেন কুদ্দুছের হৃদস্পন্দনকে আরও দ্রুত করে তুলছিল।
মেয়েটি এবার সোজা তার দিকেই হাঁটছে।
কুদ্দুছের গলা শুকিয়ে গেল। তার পা যেন মাটিতে আটকে গেছে। পালাতে চাইলেও সে পারলো না। মনে হচ্ছিল—এই মুহূর্ত থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই।
তার মাথায় একের পর এক চিন্তা ভিড় করতে লাগলো।
“যদি মেয়েটি চিৎকার করে?”
“যদি আশেপাশের লোকজন জড়ো হয়?”
“যদি সে অপমান করে, সবার সামনে ছোট করে দেয়?”
কুদ্দুছের শরীর কেঁপে উঠলো।
সে বুঝতে পারছিল—সে ভুল করেছে।
এইভাবে কারো পিছু নেওয়া, তাকে অস্বস্তিতে ফেলা—এটা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ অপরাধবোধের ঢেউ উঠলো।
কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই।
মেয়েটি এসে তার একেবারে সামনে দাঁড়ালো।
কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো।
তার চোখে ভয় আছে, রাগ আছে—কিন্তু তার থেকেও বেশি আছে এক ধরনের ক্লান্তি।
—“এই… আপনার সমস্যাটা কি?”
মেয়েটি শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললো।
কুদ্দুছ কিছু বলতে পারলো না।
—“আমার পিছু পিছু হাঁটছেন কেন?”
মেয়েটি আবার বললো,
—“অনেকক্ষণ ধরে দেখছি আপনি আমার পেছনে হাঁটছেন… আমাকে ফলো করছেন।”
চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা।
দূরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে, আর হালকা বাতাস বইছে।
কুদ্দুছ মাথা নিচু করলো।
তার মনে হচ্ছিল—এই মুহূর্তে সে পৃথিবীর সবচেয়ে অপরাধী মানুষ।
তবুও—
সে সাহস জোগাড় করলো।
ধীরে ধীরে মাথা তুললো।
—“কোনো সমস্যা নেই…”
তার কণ্ঠ কাঁপছিল,
—“আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে… তাই… আপনার পিছু নিয়েছি… একটু কথা বলার জন্য…”
কথাগুলো বলেই সে চুপ করে গেল।
তার মনে হচ্ছিল—এই স্বীকারোক্তির পর হয়তো মেয়েটি আরও রেগে যাবে।
কিন্তু—
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো।
তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
সেই রাগের জায়গায় এখন যেন অন্য কিছু—একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা।
—“ভালো লেগেছে?”
সে ধীরে বললো।
কুদ্দুছ মাথা নাড়লো।
—“মানুষকে এভাবে ভালো লাগে?”
মেয়েটির কণ্ঠে হালকা তিরস্কার,
—“না চিনে, না জেনে… শুধু দেখে?”
কুদ্দুছ কিছু বলতে পারলো না।
কারণ তার কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
সে শুধু জানে—এই মেয়েটিকে দেখার পর থেকে তার ভেতরে কিছু বদলে গেছে।
—“আমি জানি আমি ভুল করেছি…”
কুদ্দুছ ধীরে বললো,
—“কিন্তু আমি… নিজেকে থামাতে পারিনি।”
মেয়েটি গভীরভাবে তাকিয়ে রইলো।
—“আপনি জানেন এটা কী?”
সে বললো,
—“এটা ভয় দেখানো… এটা অস্বস্তি তৈরি করা…”
কুদ্দুছ মাথা নিচু করলো।
—“হ্যাঁ… আমি বুঝতে পারছি…”
তার কণ্ঠে ছিল অনুতাপ।
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ করে রইলো।
বাতাসে তখন এক ধরনের ভারী নীরবতা।
মেয়েটি ধীরে বললো,
—“আপনি যদি সত্যি কথা বলতে চান, তাহলে সামনে এসে বলতেন। এভাবে পিছু নেওয়ার মানে কি?”
কুদ্দুছ মাথা তুললো।
তার চোখে এখন লজ্জা, কিন্তু সেই সাথে এক ধরনের আন্তরিকতা।
—“আমি ভয় পেয়েছিলাম…”
সে বললো,
—“আপনি যদি কথা না বলেন… যদি অপমান করেন…”
মেয়েটি হালকা হাসলো।
—“তাহলে এখন অপমানের ভয় নেই?”
কুদ্দুছ একটু থেমে বললো,
—“আছে… কিন্তু এখন সত্যিটা বলতেই হবে।”
মেয়েটির চোখে আবার সেই গভীরতা ফিরে এলো।
—“কেন এত কথা বলতে চান আমার সাথে?”
কুদ্দুছ এক মুহূর্ত ভেবে বললো,
—“কারণ মনে হচ্ছে… আপনি সাধারণ কেউ নন…”
মেয়েটি চুপ করে গেল।
তার চোখের কোণে যেন হালকা জল জমলো।
—“আমি খুব সাধারণ…”
সে ধীরে বললো,
—“তবে আমার জীবনের গল্পটা সাধারণ না।”
কুদ্দুছের বুক কেঁপে উঠলো।
—“আমি শুনতে চাই…”
—“সব গল্প শোনার জন্য না…”
মেয়েটি বললো,
—“কিছু গল্প শুধু কষ্ট দেয়।”
কুদ্দুছ এগিয়ে এলো।
—“আমি সেই কষ্টটাই নিতে চাই।”
এই কথাটা শুনে মেয়েটি অবাক হয়ে তাকালো।
তার চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য কোমলতা ফুটে উঠলো।
—“আপনি বুঝতে পারছেন না…”
সে বললো,
—“আমার কাছে আসা মানে… নিজেকে হারানো।”
—“তাহলে আমি হারাতে রাজি।”
মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
চারপাশে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আকাশে হালকা অন্ধকার, বাতাসে এক ধরনের শীতলতা।
—“আপনার নাম কী?”
মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো।
—“কুদ্দুছ…”
—“কুদ্দুছ…”
মেয়েটি নামটা ধীরে উচ্চারণ করলো,
—“আপনি ভালো মানুষ মনে হচ্ছেন…”
কুদ্দুছ একটু অবাক হলো।
—“তাহলে?”
—“তাই বলছি—আমার থেকে দূরে থাকুন।”
এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
—“কেন?”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
তারপর ধীরে বললো,
—“কারণ আমি কাউকে সুখ দিতে পারি না…”
তার চোখ দিয়ে এবার জল গড়িয়ে পড়লো।
কুদ্দুছ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
সে বুঝতে পারছিল—এই মেয়েটির ভেতরে গভীর কোনো কষ্ট লুকিয়ে আছে।
—“আপনি কাঁদছেন কেন?”
সে জিজ্ঞেস করলো।
মেয়েটি চোখ মুছলো না।
—“কারণ আপনি ভুল সময়ে ভুল মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছেন…”
কুদ্দুছের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
তবুও সে বললো,
—“তবুও আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই…”
মেয়েটি ধীরে মাথা নাড়লো।
—“একদিন বুঝবেন… আজ যা অনুভব করছেন, তা আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে…”
এই বলে সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলো।
কুদ্দুছ দাঁড়িয়ে রইলো।
তার মনে হচ্ছিল—সে যেন একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যা খুললেই তার জীবন বদলে যাবে।
কিন্তু সেই দরজার ওপারে কী আছে—সে জানে না।
মেয়েটি দূরে চলে যাচ্ছে।
তার ছায়া অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে।
কুদ্দুছ চিৎকার করে বলতে চাইল—“থামুন!”
কিন্তু তার গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না।
সে শুধু দাঁড়িয়ে রইলো।
তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে এক অদ্ভুত অনুভূতি—
ভালোবাসা,
অপরাধবোধ,
আর এক গভীর অজানা ভয়।
সে জানে না—
এই মেয়েটি কে।
কিন্তু সে এটুকু বুঝতে পারছে—
এই গল্পের শেষটা সহজ হবে না।
হয়তো—
এটা এক এমন ভালোবাসার শুরু,
যার শেষ হবে শুধুই ট্রাজেডিতে…
চলবে…