পর্ব – ৩
তুমি কি জানো, ঐ দিনটির কথা? যেটি আজও ক্যালেন্ডারে চিহ্নিত আছে। ওটা মনে পড়লে ব্যথা দেয় অন্তরে। ঐ পাতাটাও আমার মতো খুব ব্যথিত হয়। সে মাঝে মাঝে আমার সাথে অভিমান করে, উল্টে থাকে। কেন জানো? ও যখন দেখে আমার কষ্ট—তুমি কেমন আছো, এসব কথা ভাবি—তখনই নিজে নিজে ক্যালেন্ডারের ঐ দাগ দেওয়া পাতাটি উল্টায়। ঐ দিনটি কেন জানি আজও ভুলতে পারছি না। আমি বলেছিলাম, “নেহা, তোমাকে ভালবাসি”—আর তুমি সেদিন………..
কুদ্দুছ চিঠির কাগজে এই লাইনগুলো লিখে থেমে গেল। কলমের নিবে কালি জমে শুকিয়ে আসছে, অথচ তার বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো যেন কোনোভাবেই শেষ হতে চাইছে না।
ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটা আজও সেই একই জায়গায় আছে। বছরের পর বছর বদলেছে তারিখ, মাস, বছর—কিন্তু একটি দিন যেন সময়ের গণ্ডি ভেঙে স্থির হয়ে আছে। লাল কালি দিয়ে গোল করে রাখা সেই দিনটি—অদ্ভুতভাবে জীবন্ত।
কুদ্দুছ প্রায়ই লক্ষ্য করে, অন্য সব পাতার মতো সেই পাতাটি সহজে উল্টাতে চায় না। বাতাসে দুললেও যেন একটু থমকে থাকে, একটু অভিমান করে। যেন সে-ও জানে—এই দিনটির ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অসমাপ্ত গল্প।
সেই দিনটি ছিল শরতের শেষ বিকেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের সময়। আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল, বাতাসে ছিল হালকা শীতের স্পর্শ। ক্যাম্পাসের পুরনো অশ্বত্থ গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল কুদ্দুছ। বুকের ভেতর তখন ঢেউ উঠছে—ভয়, লজ্জা, আর এক অদ্ভুত সাহসের মিশেল।
নেহাকে সে আগেই বলেছিল—
“আজ বিকেলে একটু দেখা করো, জরুরি কথা আছে।”
নেহা এসেছিল। হালকা নীল শাড়ি, চুলগুলো খোলা, চোখে এক ধরনের ক্লান্তি—যেটা কুদ্দুছ তখন ঠিক বুঝতে পারেনি।
—“কি কথা?”
নেহার কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিকতা, কিন্তু চোখে ছিল অস্থিরতা।
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। মনে হচ্ছিল, শব্দগুলো যেন গলায় আটকে গেছে। তারপর হঠাৎ করেই বলে ফেলেছিল—
—“নেহা… আমি তোমাকে ভালবাসি।”
কথাটা বলার পর যেন চারপাশের সব শব্দ থেমে গিয়েছিল।
হাওয়া বইছিল, পাতা নড়ছিল, দূরে কারো হাসির শব্দ ভেসে আসছিল—কিন্তু কুদ্দুছের কাছে সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
সে শুধু নেহার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত দ্বিধা—যেন সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু পারছে না।
তারপর ধীরে বলেছিল—
—“কুদ্দুছ… সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না…”
এই একটা বাক্য কুদ্দুছের ভেতরটা যেন ভেঙে দিয়েছিল।
—“মানে?”
—“মানে… আমরা যেটা অনুভব করি, সেটা সবসময় সম্ভব হয় না…”
কুদ্দুছের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল।
—“তুমি কি আমাকে ভালবাসো না?”
নেহা চোখ নিচু করে বলেছিল—
—“আমি… আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না…”
এই উত্তরটা কোনো উত্তর ছিল না, তবুও সবকিছু বলে দিয়েছিল।
সেদিন আকাশটা হঠাৎ করে কেমন মেঘলা হয়ে গিয়েছিল। যেন প্রকৃতিও বুঝতে পেরেছিল—একটা স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে।
কুদ্দুছ আর কিছু বলেনি। শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। নেহাও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে চলে গিয়েছিল।
সেদিনের পর থেকে তাদের সম্পর্কটা আর আগের মতো ছিল না।
কথা হতো, দেখা হতো—কিন্তু কোথায় যেন একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। অদৃশ্য, কিন্তু স্পষ্ট।
কুদ্দুছ সেই দিনটাকে ভুলতে পারেনি।
আজও পারেনি।
সে আবার চিঠির দিকে তাকাল। লিখতে শুরু করল—
“নেহা,
তুমি কি সেই দিনটার কথা মনে রেখেছ?
আমি জানি, তুমি হয়তো ভুলে যেতে চেয়েছ। কিন্তু আমি পারিনি।
আমি আজও সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে থাকি—মনে মনে।
যেখানে আমি বলেছিলাম ‘ভালবাসি’, আর তুমি চুপ করে থেকেছিলে।
তোমার সেই চুপ করে থাকা—আজও আমার সবচেয়ে বড় উত্তর।
তুমি জানো, আমি আজও ক্যালেন্ডারের সেই দিনটা বদলাই না।
সব বছর বদলায়, কিন্তু সেই তারিখটা আমার কাছে একই থাকে।
কেন জানো?
কারণ, সেদিন আমি প্রথমবার বুঝেছিলাম—ভালবাসা মানেই পাওয়া নয়।”
কুদ্দুছ লিখতে লিখতে থেমে গেল।
তার চোখ ভিজে উঠেছে।
সে জানালার বাইরে তাকাল। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। আকাশে হালকা কমলা রঙ ছড়িয়ে পড়েছে—ঠিক সেই দিনের মতো।
তার মনে হলো—সময় যেন ঘুরে আবার সেই বিকেলে ফিরে গেছে।
হঠাৎ করে তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
নেহা।
“তুমি কি এখনো সেই দিনটা মনে রাখো?”
কুদ্দুছের বুক কেঁপে উঠল।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর উত্তর দিল—
“ভুলতে পারিনি।”
কিছুক্ষণ পর আবার মেসেজ—
“আমি চেয়েছিলাম তুমি ভুলে যাও…”
কুদ্দুছ লিখল—
“সবকিছু কি ভুলে যাওয়া যায়?”
নেহা অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিল না।
তারপর লিখল—
“সেদিন আমি তোমাকে মিথ্যা বলেছিলাম…”
কুদ্দুছের চোখ বড় হয়ে গেল।
“মানে?”
নেহার উত্তর এল ধীরে—
“আমি তোমাকে ভালবাসতাম…”
এই একটা বাক্য কুদ্দুছের ভেতরটা ঝড়ের মতো নাড়িয়ে দিল।
তার হাত কাঁপতে লাগল।
“তাহলে… কেন?”
নেহার উত্তর আসতে একটু সময় নিল।
“কারণ, আমি জানতাম—আমাদের জন্য কোনো পথ নেই…
আমার পরিবার, আমার বাস্তবতা… সবকিছু আমাকে বাধ্য করেছিল…”
কুদ্দুছ ফোনটা শক্ত করে ধরে রাখল।
তার মনে হলো—আজ এতদিন পর, সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর পেল।
কিন্তু এই উত্তর তাকে শান্তি দিল না—বরং আরও কষ্ট দিল।
কারণ, এখন সে জানে—ভালবাসা ছিল, তবুও তারা এক হতে পারেনি।
নেহা আবার লিখল—
“আমি সেদিন তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি… তাই নিজেকে মিথ্যা বানিয়েছিলাম…”
কুদ্দুছ ধীরে টাইপ করল—
“তুমি কি আজও কষ্ট পাও?”
নেহার উত্তর—
“প্রতিদিন…”
এই এক শব্দেই সব কথা শেষ হয়ে গেল।
কুদ্দুছ ফোনটা রেখে দিল।
তার চোখ চলে গেল ক্যালেন্ডারের দিকে।
সেই লাল দাগ দেওয়া দিনটা যেন আজ আরও উজ্জ্বল।
সে ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতাটা স্পর্শ করল।
তার মনে হলো—এই পাতাটা শুধু একটা দিন নয়, বরং তাদের ভালবাসার এক নীরব সাক্ষী।
যে দিন তারা একে অপরকে পেয়েও হারিয়ে ফেলেছিল।
কুদ্দুছ আবার চিঠির দিকে ফিরে এল।
শেষ কয়েকটা লাইন লিখল—
“নেহা,
তুমি সেদিন যা বলোনি, আজ তা জেনেও আমার কষ্ট কমেনি।
বরং মনে হচ্ছে—আমরা দুজনই একই গল্পের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছি।
তুমি তোমার জায়গা থেকে হারিয়েছ, আমি আমার জায়গা থেকে।
তবুও একটা কথা বলি—
যদি কোনোদিন সময় আমাদের একটু সুযোগ দেয়,
তাহলে আর চুপ থেকো না…
কারণ, কিছু কথা না বলার কষ্ট—সবচেয়ে বেশি।”
চিঠিটা শেষ করে কুদ্দুছ চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হলো—আজ সে একটু হালকা।
কিন্তু পুরোটা নয়।
কারণ, কিছু ব্যথা কখনো শেষ হয় না—শুধু অভ্যাস হয়ে যায়।
বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।
আকাশে একটা তারা জ্বলছে।
কুদ্দুছ ধীরে বলল—
“নেহা… আবার পত্র দিও…”
তার কণ্ঠে ছিল না কোনো অভিযোগ, না কোনো আশা—শুধু এক গভীর অপেক্ষা।
আর ক্যালেন্ডারের সেই পাতাটা—নীরবে দুলছিল, যেন সে-ও সেই অপেক্ষার অংশ হয়ে গেছে।
(চলবে…)