ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
সময়: ০৮:০৪:৪৭ PM

সরকার গঠনের পর বিএনপির প্রথম রাজনৈতিক পরীক্ষা

মান্নান মারুফ
30-06-2026 06:48:23 PM
সরকার গঠনের পর বিএনপির প্রথম রাজনৈতিক পরীক্ষা

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের দৃষ্টি এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে, আর রাজনৈতিক দলগুলোও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির কাছে এই নির্বাচন কেবল আরেকটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়; বরং সরকার গঠনের পর জনগণের আস্থা, তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি এবং স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দলটির নীতিনির্ধারকদের ভাষায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে সরকারের প্রথম পর্যায়ের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এ কারণে দলটির অভ্যন্তরে নির্বাচনকে ‘অ্যাসিড টেস্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলীয় সূত্র, বিভিন্ন মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি পাঁচটি বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে—দলীয় ঐক্য বজায় রাখা, গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন, বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ, তৃণমূলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা এবং প্রতীকবিহীন নির্বাচনের বাস্তবতায় কার্যকর কৌশল নির্ধারণ।

প্রতীকবিহীন নির্বাচন, বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক বাস্তবতা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচনের চরিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। এ ধরনের নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা, সততা এবং দীর্ঘদিনের জনসেবার অভিজ্ঞতা ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এ বিষয়ে দল আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।

অন্যদিকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক স্থানীয় সমাজে বিভাজনের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। সেই ব্যবস্থা তুলে দেওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও সুস্থ ধারায় এগোবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

কেন এই নির্বাচন বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, জাতীয় ইস্যু ও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রভাব বিস্তার করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটাররা সাধারণত প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, জনসেবা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেন।

বিএনপির একাধিক নেতার মতে, সরকার গঠনের পর জনগণ সরকারের কর্মকাণ্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে, তৃণমূলের সংগঠন কতটা কার্যকর এবং স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা কতটা রয়েছে—এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর মিলবে এই নির্বাচনের ফলাফলে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সন্তোষজনক ফলাফল সরকারের প্রতি জনসমর্থন ও বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতার ইতিবাচক প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হবে। বিপরীতে প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল ফল এলে তৃণমূলের নেতৃত্ব, সমন্বয় এবং সংগঠন পরিচালনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এক পদে একজন প্রার্থী—ভোট বিভক্তি ঠেকানোর কৌশল

অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে একই পদে একাধিক নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে অনেক এলাকায় ভোট বিভক্ত হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য জয়ও হাতছাড়া হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে আরও সতর্ক হতে চাইছে বিএনপি।

দলীয় সূত্র জানায়, জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সাংগঠনিক প্রতিবেদন, স্থানীয় মতামত, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, জনগ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা বিবেচনায় এনে প্রার্থী নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে।

দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হয়ে ওঠে। তাই জয়ের সম্ভাবনাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এমপিদের ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলে আলোচনা

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী নির্ধারণে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও দলীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তৃণমূলের অনেক নেতার মতে, মনোনয়ন বা সমর্থন নির্ধারণে রাজনৈতিক ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা, দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা এবং জনপ্রিয়তাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

দলীয় সূত্র বলছে, আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে অনেক এলাকায় একাধিক নেতা নিজেদের প্রার্থী হওয়ার যোগ্য মনে করছেন। আবার অনেক সম্ভাব্য চেয়ারম্যান বা মেয়র প্রার্থী স্থানীয় রাজনীতিতে বর্তমান সংসদ সদস্যদের চেয়েও দীর্ঘদিন সক্রিয়। ফলে শুধুমাত্র এমপিদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে তৃণমূলে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী মো. সেলিমের মতে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে স্থানীয় প্রভাব ও গ্রুপিংয়ের বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তিনি মনে করেন, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান নেওয়া দরকার।

বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে উদ্বেগ

বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হতে পারে বিদ্রোহী প্রার্থিতা। মনোনয়ন বা দলীয় সমর্থন না পেলে কেউ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে ভোট বিভক্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এজন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে আগাম আলোচনা, স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা এবং সাংগঠনিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে ভোটের সমীকরণ বদলে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও এবার দলটির নীতিনির্ধারকদের ভাবাচ্ছে।

তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। তাঁর মতে, যেহেতু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে না, তাই একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর সক্রিয়তা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে এবং গণতান্ত্রিক চর্চা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

তবে দলীয় সূত্রের দাবি, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে স্থানীয় বাস্তবতা, জনপ্রিয়তা ও জয়ের সম্ভাবনা বিবেচনায় এনে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভোট বিভক্তি কমানোর চেষ্টা করা হবে।

প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রস্তুতিও জোরদার

শুধু বিএনপি নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি বাড়িয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একক প্রার্থী দেওয়ার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে বিএনপিকে অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও প্রার্থী বাছাইয়ের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর তুলনামূলক সুসংগঠিত প্রস্তুতি অনেক এলাকায় নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

তৃণমূলে শুরু হয়েছে নির্বাচনী তৎপরতা

দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে গণসংযোগ ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছেন। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং উপজেলা যুবদলের নেতা মো. ওমর ফারুক জানান, তিনি বিভিন্ন গ্রাম ও ওয়ার্ডে গণসংযোগের পাশাপাশি সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।

একই উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুর আলম খান হিরো বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই তিনি নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে জনগণের সমর্থন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

ভোলা, কুষ্টিয়া, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তাঁদের অনেকের বিশ্বাস, রাজনৈতিক ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতেই দল শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দলীয় ঐক্য অটুট রাখা, গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন, বিদ্রোহী প্রার্থী সামাল দেওয়া, তৃণমূলের অসন্তোষ কমানো, এমপিদের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক এড়ানো এবং প্রতীকবিহীন নির্বাচনের বাস্তবতায় কার্যকর সাংগঠনিক সমন্বয় নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সক্রিয়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণও নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা, বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতা, তৃণমূলের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে। তাই সরকার গঠনের পর বিএনপির জন্য এই নির্বাচন যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা, সে বিষয়ে দলীয় নেতাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও অভিমত প্রায় অভিন্ন। তবে নির্বাচনের প্রকৃত ফলাফলই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে সরকারের প্রতি জনমত, তৃণমূলের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আগামী দিনের রাজনীতির নতুন সমীকরণ।