ঢাকা, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০৬:৫৭:৩৭ PM

৭২ মাসও শেষ হচ্ছে না হাসপাতালের কাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক, লক্ষ্মীপুর
29-06-2026 05:35:05 PM
৭২ মাসও শেষ হচ্ছে না  হাসপাতালের কাজ

নির্ধারিত সময় ছিল মাত্র ১৮ মাস। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে ৭২ মাস, তবুও শেষ হয়নি লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের ২৫০ শয্যার নতুন ভবনের নির্মাণকাজ। দীর্ঘ ছয় বছরের স্থবিরতায় জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালটি এখনও পুরোনো ১০০ শয্যার ভবনেই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এতে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। শয্যা সংকট, স্থানাভাব ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মেঝে, করিডোর ও বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন শত শত রোগী।

হাসপাতাল ও গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে প্রায় ৩৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুন মাসে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘রুপালি জিএম অ্যান্ড সন্স কনসোর্টিয়াম’ কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও একাধিকবার প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হলেও কাজ শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী ভর্তি থাকছেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোর মেঝে, করিডোর, বারান্দা, এমনকি শৌচাগারের সামনের স্থানেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কোথাও একটি বেডে দুই থেকে তিনজন রোগী, আবার কোথাও মেঝেতে চাদর বিছিয়ে চলছে চিকিৎসা।

হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন হাফসা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বেড না পেয়ে কয়েক দিন ধরে মেঝেতে পড়ে আছি। পরিবেশ এতটাই নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর যে সুস্থ হওয়ার বদলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে আসা মিনতি রানি দাস বলেন, “একটি বেডেই একাধিক শিশুকে রাখতে হচ্ছে। এতে একজনের সংক্রমণ অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ছোট শিশুদের জন্য এটি খুবই বিপজ্জনক।”

হাসপাতালের চিকিৎসকরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. ইকবাল মাহমুদ বলেন, “ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ থাকায় কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন ভবনটি দ্রুত চালু করা না গেলে এই সংকট আরও প্রকট হবে।”

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অরূপ পাল জানান, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। সীমিত শয্যা ও জনবল নিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “২৫০ শয্যার নতুন ভবনে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হলে রোগীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমবে। পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।”

নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে ঠিকাদার ইসমাইল হোসেন বলেন, “করোনা মহামারির সময় দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ ছিল। পরে আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে কাজের গতি ব্যাহত হয়। এসব কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। তবে দ্রুত কাজ শেষ করে ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে।”

অন্যদিকে স্থানীয় গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুর রহমান জানান, পূর্বের টেন্ডারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে নির্মাণকাজ স্থগিত রয়েছে। নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করে ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে আগামী এক বছরের মধ্যে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

জেলার একমাত্র সরকারি সদর হাসপাতালের এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে প্রকল্প ঝুলে থাকায় সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, লক্ষ্মীপুর জেলার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় বর্তমান হাসপাতালের অবকাঠামো অনেক আগেই অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। তাই নতুন ভবনের নির্মাণকাজ আর বিলম্ব না করে দ্রুত শেষ করা হলে শুধু শয্যা সংকটই দূর হবে না, রোগীরা উন্নত, নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবাও পাবেন।