বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের পাশাপাশি ভূমিকম্পও দেশের জন্য একটি বড় হুমকি। যদিও বাংলাদেশে প্রতিদিন বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটে না, তবুও দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং পার্শ্ববর্তী সক্রিয় ফল্ট লাইনের কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবসময় বিদ্যমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে শক্তিশালী কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানলে তা দেশের জনবহুল নগরীগুলোতে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ কারণে ভূমিকম্পের আশঙ্কা দেশের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে আসছে।
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে বিভিন্ন মাত্রার অসংখ্য ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। এরপর ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮২, ১৯৮৬ এবং ১৯৯২ সালে ৫.২ থেকে ৫.৩ মাত্রার একাধিক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। ১৯৮৮ সালে ৫.৯ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং ১৯৮৯ ও ১৯৯৪ সালে ৫.৮ মাত্রার ভূমিকম্প দেশের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি রেকর্ড করা হয় ১৯৯৭ সালে, যার মাত্রা ছিল ৬.১। এটি দেশের ভূমিকম্প ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তী সময়েও ভূমিকম্পের ঝুঁকি অব্যাহত থাকে। ২০০০ সালে ৫.৫, ২০০৩ সালে ৫.৭ এবং ২০০৭ সালে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২০২০ সালে ৫.৯ মাত্রার এবং ২০২৩ সালে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়। ২০২৫ সালে নরসিংদী-ঢাকা অঞ্চলে ৫.৪ থেকে ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসব ভূমিকম্পের বেশিরভাগই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে না পারলেও জনগণের মধ্যে ভবিষ্যৎ বিপর্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির প্রধান কারণ হলো দেশটি ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। সিলেট, চট্টগ্রাম এবং ঢাকা অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর হওয়ায় এখানে শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হলে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ভবন নির্মাণ এবং ভূমিকম্প সহনশীল নকশা অনুসরণ না করাও ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে দুর্যোগ প্রস্তুতি ও উদ্ধার কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। বিভিন্ন জেলায় ভূমিকম্প বিষয়ক মহড়া, জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী দল গঠন করেছে। ধসে পড়া ভবন থেকে মানুষ উদ্ধার, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা এবং আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে বর্তমান প্রস্তুতি এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য বড় শহরে একসঙ্গে বহু ভবন ধসে পড়লে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
এছাড়া ভূমিকম্পের সময় কী করণীয় সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনেক মানুষ জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং আবাসিক এলাকায় নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সংস্কার বা অপসারণের কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে বিভিন্ন মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এই ঝুঁকি বিদ্যমান থাকবে। যদিও সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রস্তুতি বৃদ্ধির জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তবুও একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য আরও ব্যাপক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন। ভূমিকম্প একটি অনিবার্য প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও যথাযথ প্রস্তুতি ও সচেতনতার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য ভূমিকম্পজনিত বিপর্যয়ের ক্ষতি থেকে অধিক সুরক্ষা দিতে।