ঢাকা, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
সময়: ০৯:৩৯:২৮ PM

স্বাস্থ্যসেবাকে ডিজিটাল করতে বড় পদক্ষেপ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
24-06-2026 07:50:57 PM
স্বাস্থ্যসেবাকে ডিজিটাল করতে বড় পদক্ষেপ

দেশের স্বাস্থ্যখাতকে প্রযুক্তিনির্ভর, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় রূপ দিতে একগুচ্ছ উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হাতে নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি ধাপকে একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় এনে রোগী ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহ, রেফারেল, আর্থিক লেনদেন এবং নীতিনির্ধারণকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে দেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি সম্ভাব্য ডিজিটাল বিপ্লব হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে চালু থাকা ১১৪টিরও বেশি বিচ্ছিন্ন ডিজিটাল স্বাস্থ্য উদ্যোগকে একীভূত করে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ গঠন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ই-প্রেসক্রিপশন চালু, কেন্দ্রীয় রোগী ডাটাবেইস, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক এবং সর্বজনীন ডিজিটাল হেলথ কার্ড প্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও নাগরিকবান্ধব করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ‘স্বাস্থ্য খাতের ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচির প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছে। প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে ১৫৯ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। প্রকল্পের আওতায় দেশের বিদ্যমান ডিজিটাল স্বাস্থ্য উদ্যোগগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতাল পর্যন্ত পাঁচ স্তরের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেবাকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন অধিদফতর ও প্রতিষ্ঠানের অধীনে একাধিক ডিজিটাল সিস্টেম চালু থাকলেও তাদের মধ্যে কার্যকর তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নেই। ফলে একজন রোগীর তথ্য বারবার সংগ্রহ করতে হয়, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে নীতিনির্ধারণেও সমস্যা দেখা দেয়। নতুন প্রকল্পের আওতায় বেসলাইন জরিপ, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল স্বাস্থ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে তথ্য ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণ, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং ডেটা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে খুলনা জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্লাস্টিকভিত্তিক স্বাস্থ্য কার্ড চালু করা হবে। সফল বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তীতে তা পর্যায়ক্রমে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সামাজিক অবকাঠামো বিভাগে অনুষ্ঠিত বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। সভায় ডেটা নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সুবিধা হবে রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস সহজলভ্য হওয়া। বর্তমানে একজন রোগী জেলা হাসপাতাল থেকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে তার পূর্ববর্তী চিকিৎসার তথ্য অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে একই পরীক্ষা একাধিকবার করতে হয়, যা রোগীর সময় ও অর্থ উভয়ের অপচয় ঘটায়। নতুন প্ল্যাটফর্ম চালু হলে দেশের যেকোনো সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস, পরীক্ষার ফলাফল, প্রেসক্রিপশন, রেফারেল এবং ফলোআপ সংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে। এতে চিকিৎসার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে।

এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে চিকিৎসকদের দেওয়া প্রতিটি প্রেসক্রিপশন ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত হবে এবং রোগীর একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ইতিহাস তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রেসক্রিপশন অডিটের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, একাধিক প্রেসক্রিপশন প্রদান এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ব্যবস্থা চিকিৎসাসেবায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং তথ্যভিত্তিক স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সরকারের ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, রোগী রেফারেল, ওষুধ সরবরাহ, বিলিং এবং আর্থিক লেনদেনকে একই ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিষয়গুলো বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। ইশতেহারে ডিজিটাল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন, প্রেসক্রিপশন অডিট, রিয়েল-টাইম রেফারেল সিস্টেম, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জরুরি স্বাস্থ্যসেবা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী এবং ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক স্বাস্থ্য ইউনিট প্রতিষ্ঠা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং মা ও নবজাতকের জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মিডওয়াইফ তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।

তিনি আরও জানান, দেশের কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করা হবে না। বরং বিদ্যমান কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের আওতায় এনে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে সেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর টিকাদান, পুষ্টি এবং প্রাথমিক রোগ নির্ণয় কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকারের স্বাস্থ্য সংস্কারের প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটেও। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই বরাদ্দ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ০১ শতাংশের সমান। দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজেট প্রস্তাবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রতিটি নাগরিককে পর্যায়ক্রমে একটি ডিজিটাল হেলথ কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, পরীক্ষার ফলাফল, প্রেসক্রিপশন এবং রেফারেল তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু প্রযুক্তি বা সফটওয়্যার ব্যবহার করলেই ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা সফল হবে না। এর জন্য নিরাপদ তথ্য সংরক্ষণ, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিতকরণ, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং অভিন্ন তথ্যমান নিশ্চিত করাও জরুরি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত সফলতা প্রযুক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং মানুষকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করে। সংস্থাটির মতে, একজন রোগীর চিকিৎসাযাত্রা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে হাসপাতাল, প্রেসক্রিপশন থেকে ফার্মেসি এবং প্রতিরোধমূলক সেবা থেকে ফলোআপ চিকিৎসা পর্যন্ত একই কাঠামোর আওতায় আনতে পারলেই ডিজিটাল স্বাস্থ্য উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে সরকারের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করবে না, বরং স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, ব্যয় হ্রাস এবং সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।