ঢাকা, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬,
সময়: ০৭:৫৩:৩৫ PM

প্রশ্নের মুখে ছুটি গ্রুপের বিনিয়োগ কার্যক্রম

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
22-06-2026 05:55:39 PM
প্রশ্নের মুখে ছুটি গ্রুপের বিনিয়োগ কার্যক্রম

কক্সবাজারের ইনানীতে ৬৫ বিঘা জমির ওপর পাঁচতারকা হোটেল ও লাক্সারি ভিলা নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেয়ার বিক্রি করছে ছুটি গ্রুপ। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পটির নামে প্রচারিত জমির পরিমাণ এবং বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাধীন জমির মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মাসিক বা বার্ষিক নিশ্চিত মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

ছুটি গ্রুপের প্রচারণা অনুযায়ী, কক্সবাজারের ইনানীতে “ছুটি বিচ রিসোর্ট” নামে ৬৫ বিঘা জমির ওপর একটি ছয়তলা পাঁচতারকা হোটেল এবং ২৭টি লাক্সারি ভিলা নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের জন্য হোটেল ও ভিলার শেয়ার বিক্রির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, শেয়ারধারীরা আজীবন মালিকানার অংশীদার হবেন এবং বিনিয়োগের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্ষিক মুনাফা পাবেন।

তবে জমির মালিকানার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইনানী মৌজায় ছুটি বিচ রিসোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের নামে নিবন্ধিত জমির পরিমাণ মাত্র ১ দশমিক ২২৮৩ একর, যা প্রায় ৩ দশমিক ৭২ বিঘার সমান। এ ছাড়া ওই মৌজায় অতিরিক্ত জমি ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট দলিল প্রদর্শন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। অথচ বিপণন কার্যক্রমে ৬৫ বিঘা জমির প্রকল্প হিসেবে এটি প্রচার করা হচ্ছে।

প্রকল্পটির শেয়ার কাঠামো সম্পর্কেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, পাঁচতারকা হোটেলের জন্য মোট ১১ হাজার শেয়ার নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেক বিক্রির জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে লাক্সারি ভিলার জন্যও হাজারো শেয়ার বাজারজাত করা হচ্ছে। ভিলার প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা এবং হোটেলের প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ৬ লাখ টাকা।

সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে আজীবন মালিকানা, বিনামূল্যে অবকাশযাপনের সুযোগ, বিভিন্ন রিসোর্টে বিশেষ ছাড় এবং নিশ্চিত মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। তবে এই বিনিয়োগ কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন বা কোনো আইপিও সংক্রান্ত তথ্য প্রতিষ্ঠানটি দেখাতে পারেনি।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মূল ছুটি গ্রুপ থেকে আলাদা হয়ে গঠিত “ছুটি কক্সবাজার লিমিটেড” নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানও কক্সবাজারে অনুরূপ পদ্ধতিতে শেয়ার বিক্রি করছে। প্রতিষ্ঠানটি টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ এলাকার পাশে “ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজার” প্রকল্পের জন্য ৭ দশমিক ৬৫ বিঘা জমিতে হোটেল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু দলিল অনুযায়ী, তাদের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ মাত্র ৪ দশমিক ১৬ বিঘা।

দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ক নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। উভয় প্রতিষ্ঠান একই ধরনের লোগো ব্যবহার করছে এবং কিছু প্রকল্প নিজেদের বলে দাবি করছে। ফলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত মালিকানা ও পরিচালন কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছেন না। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হিসাব-নিকাশ ও পরিচালনাগত মতপার্থক্যের কারণে ছুটি গ্রুপ কার্যত দুটি পৃথক অংশে বিভক্ত হয়ে গেছে।

প্রকল্পের অনুমোদন সংক্রান্ত বিষয়েও অসঙ্গতি দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি যে অনুমতিপত্র প্রদর্শন করেছে, সেটি ২০১৩ সালে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে ইস্যু করা হয়েছিল। সেখানে প্রায় ৪২ বিঘা জমিতে হোটেল, ভিলা, রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে নির্মাণের অনুমতি উল্লেখ থাকলেও পাঁচতারকা হোটেলের কোনো উল্লেখ নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনুমতিপত্রে যাদের আবেদনকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা বর্তমান কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নন।

এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৮ সালের মধ্যে ভিলা এবং ২০২৯ সালের মধ্যে পাঁচতারকা হোটেল হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ভিলার নির্মাণকাজ খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং হোটেলের নির্মাণকাজ এখনও শুরু হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হোটেল ও রিসোর্টভিত্তিক এই ধরনের ‘ফ্র্যাকশনাল ওনারশিপ’ বা অংশীদারিত্বভিত্তিক বিনিয়োগ মডেল বর্তমানে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন ও বিনিয়োগকারীদের অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা থাকে না। ফলে সাধারণ মানুষ উচ্চ মুনাফার আশায় বিনিয়োগ করে ভবিষ্যতে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

বিনিয়োগে আগ্রহী কয়েকজন সম্ভাব্য গ্রাহকও বিভ্রান্তির কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একই ব্র্যান্ডের নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করায় প্রকল্পগুলোর প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় অনেকেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দ্রুত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় জমির মালিকানা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বিপুল সংখ্যক বিনিয়োগকারী আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।