ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
সময়: ০৯:১৭:১৯ PM

রাজশাহীতে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ:৬৬ শতাংশ সমকামী

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
23-06-2026 08:07:33 PM
রাজশাহীতে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ:৬৬ শতাংশ সমকামী

রাজশাহী অঞ্চলে নীরবে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজশাহীতে মোট ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯২ জন সমকামী হিসেবে চিহ্নিত, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৬৬ দশমিক ১৮ শতাংশ। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯৪ জনে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, সামাজিক সংকোচ এবং গোপন যোগাযোগ নেটওয়ার্কের কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নিয়মিত গোপন জমায়েতের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

রামেক হাসপাতালের পরিসংখ্যান

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৮৫২ জন ব্যক্তি এইচআইভি পরীক্ষা করিয়েছেন। এর মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

শনাক্তদের মধ্যে ১০৫ জন পুরুষ, ৯ জন নারী এবং একজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি। বৈবাহিক অবস্থার ভিত্তিতে আক্রান্তদের মধ্যে ৪৮ জন বিবাহিত এবং ৬৭ জন অবিবাহিত। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৩৫ জন এবং ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৮০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া প্রবাসফেরত আক্রান্তের সংখ্যা চারজন।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে ৫৮ জন সমকামী, ৩৫ জন যৌনকর্মীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি, দুজন যক্ষ্মা রোগী, একজন যৌনকর্মী, দুজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি এবং ১৪ জন সাধারণ জনগোষ্ঠীর সদস্য।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অতিরিক্ত তথ্য

সিভিল সার্জন কার্যালয় হাসপাতালের তথ্যের বাইরে আরও ৩৪ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির তথ্য সংরক্ষণ করেছে। এদের সবাই সমকামী হিসেবে চিহ্নিত। তাদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ এবং তিনজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি।

বৈবাহিক অবস্থার ভিত্তিতে ২৫ জন বিবাহিত এবং ছয়জন অবিবাহিত। বয়সভিত্তিক হিসেবে ২৫ বছরের কম বয়সী নয়জন এবং ২৫ বছরের বেশি বয়সী ২৫ জন রয়েছেন।

রামেক হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজশাহীতে শনাক্ত হওয়া ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ৯২ জন সমকামী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণের ধরণ ও ঝুঁকির চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

রাজশাহী বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের আট জেলায় মোট ৭৯৪ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন।

জেলাভিত্তিক আক্রান্তের সংখ্যা হলো—

  • সিরাজগঞ্জ: ৩১০ জন
  • রাজশাহী: ১৩১ জন
  • বগুড়া: ১০৯ জন
  • পাবনা: ৭৮ জন
  • নওগাঁ: ৬৫ জন
  • নাটোর: ৪৩ জন
  • জয়পুরহাট: ৩৭ জন
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ: ২১ জন

এর মধ্যে সর্বাধিক আক্রান্তের সংখ্যা সিরাজগঞ্জ জেলায়। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির এ প্রবণতা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।

গোপন নেটওয়ার্ক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর কয়েকটি নির্জন এলাকায় রাতের বেলায় কিছু ব্যক্তির নিয়মিত জমায়েত হয়। স্থানীয়ভাবে সি অ্যান্ড বি মোড় (শিমলা), কোর্ট স্টেশন, ডিঙাডোবা, ফুলতলা এবং পদ্মাপাড়ের কয়েকটি স্থানের নাম আলোচনায় রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, এসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের গোপন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো বিশেষ অভিযান বা কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু সরাসরি যোগাযোগ নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভিন্ন গ্রুপ ও নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সদস্য সংগ্রহ, যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই যোগাযোগব্যবস্থা সংক্রমণ শনাক্ত ও প্রতিরোধ কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলছে।

সচেতনতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রয়োজন

এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোষ’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা বলেন, সমাজের অনেক মানুষ এখনো এইচআইভি আক্রান্তদের নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। এর ফলে আক্রান্তরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, “এইচআইভি আক্রান্ত মানেই যে যৌন সংক্রমণের শিকার, তা নয়। রক্ত সঞ্চালন, দূষিত সিরিঞ্জ ব্যবহার কিংবা মা থেকে শিশুর শরীরেও এই ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। সরকার বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে, তবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়াতে হবে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আক্রান্ত ব্যক্তি বলেন, “অসচেতনতা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কারণে আমি এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছি। পরে রোগটি এইডস পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমাজে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, কারণ অনেকেই এখনো রোগটির ঝুঁকি ও পরিণতি সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না।”

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন) ডা. মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, গত কয়েক বছরে দেশে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তার ভাষ্য, “পুরুষ সমকামীদের মধ্যে, বিশেষ করে রিসেপ্টিভ পার্টনারদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ পায়ুপথের টিস্যু সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।”

তিনি আরও বলেন, “এইচআইভি শুধু যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায় না। পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহণ, একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার, মাদক গ্রহণে ব্যবহৃত সূঁচ ভাগাভাগি করা এবং মা থেকে শিশুর শরীরেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।”

রামেক হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের ফোকাল পারসন ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ বলেন, “যৌন আচরণজনিত কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে সমকামীদের মধ্যে শনাক্তের হার বেশি। একই সঙ্গে যৌনপল্লিতে যাতায়াতকারীদের মধ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক। তবে আক্রান্তদের শনাক্ত হওয়া ইতিবাচক বিষয়, কারণ এতে তারা চিকিৎসার আওতায় আসেন এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে।”

চিকিৎসাসেবায় ভোগান্তি

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার চালু হলেও অনেক রোগী এখনো চিকিৎসাসেবা গ্রহণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

আক্রান্তদের অভিযোগ, গত বছরের ডিসেম্বরে রাজশাহীতে এআরটি সেন্টার চালু হলেও এর আগে শনাক্ত হওয়া অনেক রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত ফাইল এখনো বগুড়ার শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে নিয়মিত ওষুধ সংগ্রহ ও ফলোআপ চিকিৎসার জন্য তাদের বগুড়ায় যেতে হচ্ছে।

তাদের দাবি, ফাইল দ্রুত রাজশাহীতে স্থানান্তর করা হলে রোগীরা স্থানীয়ভাবে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন। একাধিক রোগী জানান, দীর্ঘ দূরত্বে নিয়মিত যাতায়াত মানসিক ও আর্থিক উভয় ক্ষেত্রেই তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচআইভি সংক্রমণ মোকাবিলায় কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে দোষারোপ না করে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত পরীক্ষা, নিরাপদ যৌন আচরণ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আক্রান্তদের প্রতি বৈষম্যমুক্ত আচরণ এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।