ঢাকা, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৭:৫৪:২১ PM

সাত জেলায় বন্যায় মৃত্যু ৫১,ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
12-07-2026 05:31:10 PM
সাত জেলায় বন্যায় মৃত্যু ৫১,ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ

অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। একই সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। রোববার (১২ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা বন্যা, পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব জেলার মোট ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা দুর্যোগের সরাসরি প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।

কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজার জেলায়। সেখানে মোট ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া জেলায় আহত হয়েছেন ২৪ জন, যাদের মধ্যে ১৯ জন স্থানীয় এবং পাঁচজন রোহিঙ্গা। এখনও একজন নিখোঁজ রয়েছেন।

চট্টগ্রামে বন্যা ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১২ জন। বান্দরবানে প্রাণ হারিয়েছেন ছয়জন, আহত হয়েছেন দুজন। রাঙামাটিতে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। খাগড়াছড়িতে একজন আহত হয়েছেন। তবে হবিগঞ্জে এখন পর্যন্ত হতাহত হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের মুখে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। সেখানে প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০টি।

এছাড়া কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন, খাগড়াছড়িতে ৩৪ হাজার ৪১৭ জন, হবিগঞ্জে ২৮ হাজার ১৪০ জন, মৌলভীবাজারে ২৬ হাজার ৫৪৪ জন, বান্দরবানে ৮ হাজার ৩৫০ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৫২৪ জন।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, অনেক এলাকায় এখনো পানি পুরোপুরি নামেনি। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে কিছু এলাকায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়ে গেছে।

আশ্রয়কেন্দ্রে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাত জেলায় মোট ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

চট্টগ্রামে সর্বাধিক ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ২১ হাজার ৯০০ জন অবস্থান করছেন। বান্দরবানের ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৬ হাজার ২৫০ জন। রাঙামাটির ৫০টি কেন্দ্রে রয়েছেন ৩ হাজার ৬৩৭ জন এবং খাগড়াছড়ির ১৫০টি কেন্দ্রে অবস্থান করছেন ২ হাজার ৮৮৩ জন।

এছাড়া মৌলভীবাজারের ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ১৭২ জন এবং কক্সবাজারের ২৭টি কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। হবিগঞ্জে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও সেখানে কতজন আশ্রিত রয়েছেন, তা এখনও জানানো হয়নি।

সাত জেলার জন্য বরাদ্দ ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য মোট ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

জেলাভিত্তিক বরাদ্দ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের জন্য ৬৫ লাখ টাকা ও ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল, কক্সবাজারের জন্য ৩০ লাখ টাকা ও ৪৫০ মেট্রিক টন চাল, রাঙামাটির জন্য ২৫ লাখ টাকা ও ৫০০ মেট্রিক টন চাল এবং খাগড়াছড়ির জন্য ২০ লাখ টাকা ও ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া বান্দরবানের জন্য ২০ লাখ টাকা ও ৪০০ মেট্রিক টন চাল, মৌলভীবাজারের জন্য ১০ লাখ টাকা ও ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং হবিগঞ্জের জন্য ৫ লাখ টাকা ও ১০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, একই সময়ে দেশের ৬৪ জেলার জন্য সাধারণ ও দুর্যোগকালীন সহায়তা হিসেবে অতিরিক্ত ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল ছাড় করা হয়েছে।

ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকায় ইতোমধ্যে ব্যাপক ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। চট্টগ্রামে ৭১০ মেট্রিক টন চাল, ৬০ লাখ টাকা, ৩৯ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১৫ হাজার ১০০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

বান্দরবানে বিতরণ করা হয়েছে ৬৮ মেট্রিক টন চাল, ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ২৩৫ প্যাকেট শিশুখাদ্য এবং ২ হাজার ৯৫৩ প্যাকেট রান্না করা ও শুকনো খাবার। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে আরও ১ হাজার ৮৪৫ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

মৌলভীবাজারে ১১০ মেট্রিক টন চাল, ৫ লাখ টাকা এবং ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে হবিগঞ্জে ১০ মেট্রিক টন চাল, ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ১ হাজার ৪১৭ প্যাকেট শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে।

উদ্ধার কার্যক্রম চলমান

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার, আশ্রয় ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ত্রাণসামগ্রী ও অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকা এবং নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।