আগামী ১৬ আগস্ট বর্তমান বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং ছয় মাস পর কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ায় সরকারের ভেতরে এখন বড় ধরনের রদবদলের জোর আলোচনা চলছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, মন্ত্রীদের পারফরম্যান্স এবং প্রশাসনিক সমন্বয় সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন মাধ্যমে সরাসরি তথ্য নিয়ে সেগুলোর পর্যালোচনা করছেন। মূল্যায়নের ভিত্তিতে কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তন, কেউ কেউ মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া এবং নতুন কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের আলোচনার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি পদ নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষমতা দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্থায়ী কমিটি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিয়েছে এবং তিনি ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর বর্তমান দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি দলের মহাসচিব পদেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্রের দাবি, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মো. রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের উপনেতা পদও নতুন করে নির্ধারণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে বর্তমান প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নাম আলোচনায় রয়েছে। বিকল্প হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন এবং রুহুল কবির রিজভীকে স্থানীয় সরকার বা তথ্য মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সূত্র জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে জাতীয় সংসদের উপনেতা করার সম্ভাবনা অনেকটাই নিশ্চিত। পাশাপাশি তাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকে কাউকে প্রতিমন্ত্রী করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও গতিশীলভাবে পরিচালনা করা যায়।
সরকারের মূল্যায়নে মন্ত্রীদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি, জনঅভিযোগ নিষ্পত্তি, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, সংসদে উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত খুব কম মন্ত্রীই উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পেরেছেন বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে। যদিও কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীর পারফরম্যান্স তুলনামূলক সন্তোষজনক বলে জানা গেছে।
একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন মন্ত্রী অতিরিক্ত দায়িত্বের কারণে কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজ করতে পারছেন না বলে সরকারের মূল্যায়নে উঠে এসেছে। তাই তাঁদের দায়িত্ব সীমিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বাণিজ্য, শিল্প এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে শেখ রবিউল আলম সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, রেল এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। ভবিষ্যতে তাঁদের একটি করে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রাখা হতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির অগ্রগতি এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের অসন্তোষ রয়েছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লোডশেডিং না থাকার দাবি করা হলেও প্রধানমন্ত্রীর অনুসন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নানা অনিয়মও সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। এ কারণে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দায়িত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। টুকুকে শিল্প অথবা রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলেও জানা গেছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের দপ্তর পরিবর্তন অথবা তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে। সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, পানিসম্পদ এবং তথ্য মন্ত্রণালয়েও নতুন মুখ আসতে পারে। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি অঞ্চল থেকে একজন পূর্ণমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল এবং প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন।
মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুল ইসলাম বাবুল, সরকারি দলের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এবং মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন, রেহান আসিফ আসাদ, হুমায়ন কবির ও ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন। এছাড়া রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের নবনির্বাচিত এমপিদের মধ্য থেকে চারজন উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন।
অন্যদিকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং ড. আব্দুল মঈন খানসহ বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া সম্ভব না হলেও আগামী সংসদ অধিবেশনে বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।