ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৩:৪৬:৫৬ PM

উপন্যাস: অসমাপ্ত পর্ব–৮

মান্নান মারুফ
02-02-2026 12:09:08 PM
উপন্যাস: অসমাপ্ত পর্ব–৮

পর্ব–৮ : দূরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত

হঠাৎ করেই আরও দূরে থাকতে চায় সমাপ্তি আর কুদ্দুছ—দু’জনেই। এ দূরত্ব কোনো ঝগড়া থেকে আসেনি, কোনো বড় ঘটনার ফলও নয়। বরং এটা এসেছে দীর্ঘ নীরবতা, জমে থাকা অভিমান আর না বলা কষ্টের ভেতর থেকে। দু’জনেই আলাদা আলাদা ভাবে ভাবতে শুরু করেছে—আর যেন কারো সাথে দেখা না হয়। যেন একে অপরের সামনে পড়তে না হয়। যতটা সম্ভব দূরে চলে যেতে হবে। এমন দূরে, যেখানে পুরনো স্মৃতিগুলো সহজে পিছু নিতে না পারে।

সমাপ্তি এই ভাবনাটা প্রথমে নিজের কাছেই স্বীকার করতে পারেনি। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, তার ভেতরে একটা তীব্র তাড়না তৈরি হয়েছে—এই শহর, এই ক্যাম্পাস, এই পরিচিত মানুষগুলো থেকে সরে যেতে হবে। কারণ এখানকার প্রতিটি কোণে কুদ্দুছের স্মৃতি লেগে আছে।

সে সিদ্ধান্ত নেয়, স্কলারশিপ নিয়ে কোথাও চলে যাওয়ার চেষ্টা করবে। দেশের বাইরে না হলেও, অন্তত অনেক দূরে। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, নতুন জীবন। হয়তো সেখানে গেলে বুকের ভেতরের ভারটা একটু হালকা হবে।

সমাপ্তি নিয়মিত খোঁজ নিতে শুরু করে স্কলারশিপের। সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলে। ইমেইল পাঠায়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করতে থাকে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়—সে খুব দৃঢ়, খুব আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে পড়ে বারবার।

কারণ প্রতিটি কাগজে সই করার সময় তার মনে হয়—এই সইয়ের সাথে সাথে কি কুদ্দুছকেও ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছে সে?

অন্যদিকে কুদ্দুছও একই রকম এক অদ্ভুত মানসিক অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সে নিজেকে উদাস উদাস অনুভব করে। কোনো কিছুতেই মন বসে না। কাজের টেবিলে বসেও মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সমাপ্তির মুখ।

সে বুঝতে পারে—এই শহরে থেকে গেলে, এই জীবনে আটকে থাকলে, সে কখনোই সামনে এগোতে পারবে না। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মোড় তাকে সমাপ্তির দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই সেও মনে মনে দূরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

একদিন হঠাৎ করেই সে কানাডা যাওয়ার কথা ভাবে। ভাবনাটা প্রথমে অবাস্তব মনে হলেও, ধীরে ধীরে সেটাই তার কাছে একমাত্র পথ বলে মনে হয়। দূর দেশ, অচেনা মানুষ, নতুন সংগ্রাম—সব মিলিয়ে হয়তো সে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারবে।

কুদ্দুছ কয়েকজন পরিচিত মানুষের সাথে কথা বলে। কেউ স্টাডি ভিসার কথা বলে, কেউ ওয়ার্ক পারমিটের। সে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করতে শুরু করে। সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট—সবকিছু একে একে গোছাতে থাকে।

এই ব্যস্ততার মাঝেও সমাপ্তি তার মাথা থেকে যায় না। বরং যত বেশি ব্যস্ত হয়, তত বেশি করে মনে পড়ে।

এরই মধ্যে একদিন কুদ্দুছ শুনে ফেলে—সমাপ্তির ভিসা হয়ে গেছে। খবরটা সে সরাসরি সমাপ্তির কাছ থেকে শোনে না। অন্য একজনের কাছ থেকে শোনে।

এই খবরটা শুনে কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে কেঁপে ওঠে। সে জানে না কেন, কিন্তু প্রচণ্ড কষ্ট পায়। মনে হয়—সমাপ্তি তাহলে সত্যিই চলে যাচ্ছে। এত দূরে, যেখানে সে আর কখনো পৌঁছাতে পারবে না।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় এই বিষয়টা—সমাপ্তি নিজে তাকে কিছু বলেনি। একবারও জানায়নি। হয়তো জানাতে চায়নি। হয়তো মনে করেছে, জানানোর মতো কোনো সম্পর্ক আর অবশিষ্ট নেই।

কুদ্দুছ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। কাউকে কিছু বলে না। তার ভেতরের অভিমানটা আরও শক্ত হয়ে যায়। সে ভাবে—আমি কি তাহলে এতটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছি?

অন্যদিকে সমাপ্তিও জানে—কুদ্দুছ হয়তো এই খবর শুনেছে। কিন্তু সে ইচ্ছা করেই কিছু বলে না। সে ভয় পায়—কথা বললে আবার সবকিছু নড়ে উঠবে। আবার পুরনো অনুভূতিগুলো জেগে উঠবে। সে আর সেই জায়গায় ফিরতে চায় না।

দু’জনেই এখন দূরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কিন্তু এই প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপে তারা একে অপরকে আরও বেশি করে অনুভব করছে। দূরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাই যেন প্রমাণ করে দিচ্ছে—তারা এখনো কতটা কাছাকাছি।

রাতের বেলা কুদ্দুছ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে—কানাডার আকাশ কি এই আকাশের মতোই হবে? সেখানে কি সমাপ্তির স্মৃতি তাকে তাড়া করবে?

অন্যদিকে সমাপ্তিও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবে—নতুন দেশে গিয়ে কি সে সত্যিই সব ভুলে থাকতে পারবে? নাকি প্রতিটি নতুন সকাল কুদ্দুছের নাম নিয়েই শুরু হবে?

দু’জনেই জানে না—এই দূরে চলে যাওয়া তাদের মুক্তি দেবে, নাকি আরও বড় শূন্যতা তৈরি করবে।

একটা বিষয় শুধু স্পষ্ট—এই ভালোবাসা এখনো শেষ হয়নি। তারা শুধু দূরে সরে গিয়ে ভালোবাসাটাকে বাঁচাতে চাইছে, না কি ধীরে ধীরে মেরে ফেলছে—তা সময়ই ঠিক করবে।

দূরে যাওয়ার এই সিদ্ধান্তের মাঝেই তাদের অসমাপ্ত ভালোবাসা আরও একবার নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে যায়।

চলবে...........