দুই প্রান্তের মানুষ
পৃথিবীটা বড় অদ্ভুত। একই আকাশের নিচে থেকেও মানুষ কত দূরে চলে যেতে পারে—তা হয়তো দূরত্বে নয়, নীরবতায় বোঝা যায় সবচেয়ে বেশি। সমাপ্তি আর কুদ্দুছ—দুজনেই এখন পৃথিবীর দুই প্রান্তে। একজন আমেরিকার এক শহরে, অন্যজন অস্ট্রেলিয়ার অচেনা এক আকাশের নিচে। অথচ একসময় তারা ছিল একই শহরের একই বিকেলের মানুষ, একই চায়ের কাপে ভাগ করা স্বপ্নের সঙ্গী।
দুজনেই ভালোভাবেই পৌঁছেছে। বিমানের চাকা যখন মাটিতে ছুঁয়েছে, তখন তাদের চারপাশে ছিল মানুষ, কোলাহল, ব্যস্ততা। কিন্তু বুকের ভেতরে—একটা অদ্ভুত শূন্যতা। সেই শূন্যতার নাম কেউ জানে না, কেউ উচ্চারণও করে না।
সমাপ্তি মনে করেছিল, কুদ্দুছ বাংলাদেশেই আছে। বাড়িতেই আছে। আগের মতোই হয়তো সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখে, হয়তো চুপচাপ চা খায়, হয়তো তাকে মনে করে। আর কুদ্দুছও জানত—সমাপ্তি এখনও বাড়িতেই। মায়ের সঙ্গে, বইয়ের মধ্যে, নিজের ছোট্ট ঘরের জানালায় আটকে থাকা এক আকাশে।
কিন্তু সত্যিটা ছিল ভিন্ন।
একদিন সকালে, অস্ট্রেলিয়ার এক ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বসে কুদ্দুছ খবরের কাগজ খুলেছিল। অভ্যাসটা সে ছাড়তে পারেনি। দেশ বদলালেও সকালবেলার কাগজ পড়া—এই একটা জিনিস তার ভেতরে একই রয়ে গেছে। চোখ বুলাতে বুলাতে হঠাৎই একটা ছোট খবরের দিকে আটকে গেল তার দৃষ্টি।
একটা পরিচিত নাম।
সমাপ্তি।
খবরটা খুব বড় ছিল না। ছোট্ট এক কলামে লেখা—“উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়া গমন করেছেন…” শেষে সবার কাছে দোয়া চাওয়া।
কুদ্দুছের হাত কেঁপে উঠল। কাগজটা একটু ভাঁজ হয়ে গেল। বুকের ভেতরে যেন কেউ আচমকা একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল—তাহলে সে চলে গেছে? সত্যিই চলে গেছে?
সে জানত না কেন, কিন্তু মনে হচ্ছিল—এই খবরটা তার জানার কথা ছিল। অথচ সে জানত না। কেউ তাকে জানায়নি। সমাপ্তিও না।
কুদ্দুছ চুপচাপ বসে রইল অনেকক্ষণ। জানালার বাইরে রোদ, মানুষ হাঁটছে, গাড়ি চলছে—সব স্বাভাবিক। শুধু তার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে পড়ছিল। খুব শব্দ করে না, খুব চোখে পড়ে না—কিন্তু ভাঙছিল।
অন্যদিকে, আমেরিকার এক ছোট্ট ঘরে বসে সমাপ্তিও খবরটা দেখেছিল। কেউ একজন মেসেজ করে পাঠিয়েছিল স্ক্রিনশট। সে প্রথমে বুঝতেই পারেনি। নামটা পড়ে একটু নড়েচড়ে বসেছিল।
কুদ্দুছ।
খবরটা পড়ে তার বুকের ভেতরেও একই প্রশ্ন—তাহলে সেও দেশের বাইরে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে একটা পুরোনো অভিমান মাথা তুলে দাঁড়াল। এত বড় সিদ্ধান্ত, অথচ একটা কথাও না? না জানিয়ে, না বলে—এভাবেই?
সমাপ্তি জানত না, কুদ্দুছও জানত না। দুজনেই ধরে নিয়েছিল—অন্যজন জানে। অথচ বাস্তবে দুজনেই ছিল অন্ধকারে।
এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর রসিকতা।
মোবাইলটা হাতে নিয়েছিল সমাপ্তি। ফেসবুক খুলেছিল। কুদ্দুছের প্রোফাইল ছবি বদলায়নি। আগের সেই ছবিটাই—চোখে গভীরতা, মুখে চাপা হাসি। সে প্রোফাইলটা ফলো করে। কুদ্দুছও করে।
কিন্তু কেউ কিছু লেখে না।
কেউ “কেমন আছো” লেখে না। কেউ “শুভকামনা” লেখে না। কেউ নিজের জীবনের সুখ–দুঃখ, অর্জন–ব্যর্থতার কথা শেয়ার করে না। যেন দুজনেই অদৃশ্য একটা চুক্তি করে নিয়েছে—নীরব থাকব।
এই নীরবতার ভেতরেই জমে থাকে সব প্রেম, সব অভিমান।
রাতে সমাপ্তির ঘুম আসে না। বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিদেশের ছাদ, বিদেশের আলো। তবুও চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে পরিচিত একটা কণ্ঠ—কুদ্দুছের।
“সব সময় ঠিক থাকতে হবে—এই দায় তোমার না।”
সে হালকা করে হাসে। আবার চোখ ভিজে আসে।
কুদ্দুছও রাত জাগে। অস্ট্রেলিয়ার রাত নীরব, ঠান্ডা। সে চুপচাপ বসে ল্যাপটপ বন্ধ করে জানালার পাশে দাঁড়ায়। আকাশটা অন্য রকম, তারা গোনার মতো নয়। তবু সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে—এই আকাশই কি সমাপ্তিও দেখছে?
হয়তো না।
ফেসবুক আছে। মেসেঞ্জার আছে। হোয়াটসঅ্যাপ আছে। এই যুগে দূরত্ব মানে তো আর দূরত্ব নয়। তবু তাদের মাঝখানে একটা দেয়াল—যার নাম সাহস।
একটু সাহস হলে হয়তো সব বদলে যেত।
কিন্তু সাহসের আগেই এসে দাঁড়িয়েছে অভিমান।
“ও চাইলে আগে জানাতে পারত,”—সমাপ্তি ভাবে।
“ও চাইলে জিজ্ঞেস করতে পারত,”—কুদ্দুছ ভাবে।
এই চাইলে–চাইলের মাঝখানেই হারিয়ে যাচ্ছে তাদের গল্প।
একদিন সমাপ্তি নিজের ডায়েরি খুলে লেখে—
“আমরা কি সত্যিই দূরে চলে গেছি, নাকি শুধু কথা বলা বন্ধ করেছি?”
কুদ্দুছ তার নোটে লেখে—
“সবচেয়ে কাছের মানুষটাই কখন যে অচেনা হয়ে যায়, বোঝা যায় না।”
তারা জানে না—এই নীরবতাই কি শেষ, নাকি এটাই আবার শুরু হওয়ার আগের সবচেয়ে দীর্ঘ বিরতি।
দুজনই এখন নতুন দেশে, নতুন জীবনের পথে। তবু ভেতরের মানুষটা একই রয়ে গেছে। শুধু অপেক্ষায় আছে—একটা শব্দের, একটা বার্তার, একটা ছোট সাহসের।
এই গল্প এখানেই থামে না।
কারণ কিছু গল্প অসমাপ্ত থাকে বলেই—বেঁচে থাকে।
চলবে............