ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৩:৪৬:৫১ PM

ভোটের দোরগোড়ায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
03-02-2026 12:28:27 PM
ভোটের দোরগোড়ায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কড়া নাড়ছে দোরগোড়ায়। দীর্ঘদিন ধরে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত দেশবাসী যেমন নাগরিক অধিকার প্রয়োগের অপেক্ষায় অধীর, তেমনি ভোটের মাঠেও প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় ফলাফলে এখনো বড় ব্যবধান থাকলেও গত এক সপ্তাহে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট অন্তত কিছু আসনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। Dhakapress24.com এর নির্বাচনপূর্ব এলাকাভিত্তিক জরিপে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি ১৮০টি আসনে এগিয়ে থেকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট বর্তমানে ৪৮টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। বাকি আসনগুলোতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে, যা শেষ মুহূর্তে ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। এই দোদুল্যমান আসনগুলো বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়লে, ২০০১ সালের পর আবারও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

সাম্প্রতিক এই জরিপে দেশের আটটি বিভাগের সংসদীয় আসনভিত্তিক সম্ভাব্য রাজনৈতিক চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বিভাগীয় হিসাবে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসনে এগিয়ে থাকলেও কয়েকটি নির্দিষ্ট বিভাগে জামায়াত জোট তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি বিএনপির বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি অনেক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলছে।

ঢাকা বিভাগ

জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে বিএনপি আবারও প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। বিভাগের মোট ৫০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি ৩৭টিতে এগিয়ে রয়েছে। এ বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জামায়াত জোটের তুলনায় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছেন। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা ৪টি আসনে এগিয়ে থাকলেও জামায়াত জোট এগিয়ে রয়েছে ৩টিতে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ২টি আসনে এগিয়ে আছে। বাকি ৪টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। রাজধানীকেন্দ্রিক এই বিভাগে বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি বিএনপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিভাগ

চট্টগ্রাম বিভাগে বিএনপি সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এ বিভাগের মোট ৫৮টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি ৪৭টিতে এগিয়ে আছে। জামায়াত জোট এগিয়ে রয়েছে মাত্র ৩টি আসনে। এ ছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। বাকি ৬টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামে বিএনপির সুসংগঠিত দলীয় কাঠামো ও ঐক্যবদ্ধ ভোটব্যাংকই এই বড় ব্যবধান তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।

রংপুর বিভাগ

রংপুর বিভাগে চিত্র তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। বিভাগের মোট ৩৩টি আসনের মধ্যে জামায়াত জোট ১৮টিতে এগিয়ে রয়েছে, যা বিভাগীয় হিসাবে তাদের সবচেয়ে শক্ত অবস্থান। বিএনপি এগিয়ে রয়েছে ১০টি আসনে। জাতীয় পার্টি ৩টি আসনে এগিয়ে থাকলেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রংপুর অঞ্চলে জামায়াত জোটের ঐতিহ্যগত প্রভাব ও সাংগঠনিক সক্রিয়তাই তাদের এগিয়ে থাকার প্রধান কারণ।

রাজশাহী বিভাগ

রাজশাহী বিভাগে, যেখানে মোট ৩৯টি আসন রয়েছে, সেখানে বিএনপি ২১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। জামায়াত জোট এগিয়ে রয়েছে ৫টি আসনে। তবে এ বিভাগের উল্লেখযোগ্য দিক হলো—১৩টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা। বিশ্লেষকদের ধারণা, রাজশাহীতে ভোটের সমীকরণ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরিবর্তিত হতে পারে।

খুলনা বিভাগ

খুলনা বিভাগে মোট ৩৬টি আসনের মধ্যে বিএনপি ১৭টিতে এগিয়ে রয়েছে। জামায়াত জোট ১২টি আসনে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা ২টি আসনে এগিয়ে থাকলেও ৫টি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শিল্পাঞ্চল ও নগরকেন্দ্রিক ভোটারদের ভূমিকা এখানে ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ময়মনসিংহ বিভাগ

ময়মনসিংহ বিভাগে মোট ২৪টি আসনের মধ্যে বিএনপি ১৭টিতে এগিয়ে রয়েছে। জামায়াত জোট ২টি এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা ৪টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। মাত্র ১টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। জরিপে প্রতিফলিত হয়েছে, এই বিভাগে বিএনপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা তুলনামূলকভাবে দৃঢ়।

বরিশাল বিভাগ

বরিশাল বিভাগে ২১টি আসনের মধ্যে বিএনপি ১৬টিতে এগিয়ে রয়েছে। জামায়াত জোট ৩টি এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। ৩টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। দক্ষিণাঞ্চলের এই বিভাগে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব জরিপে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

সিলেট বিভাগ

সবশেষে সিলেট বিভাগে জামায়াত জোটের অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল বলে জরিপে উঠে এসেছে। মোট ১৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি ১৫টিতে এগিয়ে রয়েছে। জামায়াত জোট মাত্র ২টি আসনে এগিয়ে আছে। অন্যদিকে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ১টি আসনে এগিয়ে থাকলেও ২টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

সার্বিকভাবে জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাতীয় পর্যায়ে বিএনপি এখনো সুস্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে। তবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট কিছু নির্দিষ্ট বিভাগ—বিশেষ করে রংপুর এবং আংশিকভাবে খুলনায়—উল্লেখযোগ্য শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা একাধিক বিভাগে ভোটের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে। শেষ পর্যন্ত ভোটের দিনে এই অগ্রগতি কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে, সেটিই এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।