বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল আজ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে মংলা বন্দর, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠার কারণে এ অঞ্চলের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উন্নয়নের এত বড় বড় প্রকল্পের মাঝেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজের অভাবে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি থাকা সত্ত্বেও এখনো নির্মিত হয়নি প্রয়োজনীয় সেই সেতু। ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, রোগী—সবার জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে দুর্ভোগের ছাপ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তারা একটি ব্রিজের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। নদী বা খালের দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা কিংবা অস্থায়ী ফেরি ব্যবস্থা। বর্ষা মৌসুমে এই দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন পারাপার হতে হয় শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের। অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে। জরুরি রোগী হাসপাতালে নিতে গিয়ে সময় নষ্ট হওয়ায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকাটিতে মংলা বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণের ফলে প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করে। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদেরও প্রতিনিয়ত যাতায়াতে সমস্যায় পড়তে হয়। একটি ব্রিজ না থাকায় পরিবহন খরচ বাড়ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি না হলে এই অঞ্চলের পূর্ণ সম্ভাবনা কখনোই কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।
শিক্ষার্থীরাও এই সমস্যার বড় ভুক্তভোগী। অনেক শিক্ষার্থী প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় পার হয়ে স্কুল ও কলেজে যায়। খারাপ আবহাওয়ার দিনে অনেক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও যেতে পারে না তারা। ফলে শিক্ষার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় অভিভাবকরা দ্রুত একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে কৃষকরাও রয়েছেন চরম দুর্ভোগে। উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে ব্রিজ নির্মাণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি নেই বলেই অভিযোগ সাধারণ মানুষের। অনেকেই মনে করছেন, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই অঞ্চলের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। উন্নয়নের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও একটি সেতুর অভাবে মানুষের মৌলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়া সত্যিই দুঃখজনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ব্রিজ নির্মাণ শুধু যোগাযোগ সহজ করবে না; বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করবে। শিল্পকারখানার পণ্য পরিবহন সহজ হবে, কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের ভোগান্তি কমে আসবে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
স্থানীয় জনগণের দাবি, আর আশ্বাস নয়—এবার বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। দ্রুত ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে। উন্নয়নের ধারাকে টেকসই করতে হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই জনপদের মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ করা।