নারায়ণগঞ্জের পুরনো লঞ্চঘাটে এক সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া একটি মানবিক ঘটনা এখন স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। মাগরিবের আজানের পর যখন ঘাট ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল, নদীর ওপর নেমে আসছিল হালকা কুয়াশা, তখনই শুরু হয় এক অসহায় তরুণী ও এক মধ্যবয়স্ক রিকশাচালকের নতুন জীবনের গল্প। মানবতা, সহানুভূতি ও বিশ্বাসের এই গল্প এখন এলাকাবাসীর কাছেও এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সারাদিন রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত শরীরে ঘাটের পাশ দিয়ে ফিরছিলেন রহিম উদ্দিন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। জীবনের বেশিরভাগ সময় কষ্টের মধ্য দিয়েই কেটেছে তার। পাঁচ বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একাকীত্ব যেন আরও ঘন হয়ে ওঠে। ছোট্ট টিনের ঘরে একাই থাকতেন তিনি। সংসার বলতে আর কেউ ছিল না। তবুও প্রতিদিন রাতে বাসায় ফেরার আগে নদীর পাড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ছিল তার অভ্যাস। তার ভাষায়, “নদীর বাতাসে মনটা একটু শান্ত হয়।”
সেদিনও তিনি নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ তার চোখে পড়ে ঘাটের এক কোণায় বসে থাকা এক তরুণীকে। মাথা নিচু করে বসে থাকা মেয়েটির চোখে ছিল কান্না, গায়ে ভেজা ওড়না আর পাশে ছোট্ট একটি ব্যাগ। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো কেউ আসবে তাকে নিতে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও কাউকে না দেখে এগিয়ে যান রহিম মিয়া।
কাছাকাছি গিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “মা, কোনো সমস্যা হইছে?”
তরুণীটি কাঁদতে কাঁদতে জানায়, তার নাম নীলা। বাড়ি বরিশালে। ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। কয়েকদিন আগে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাকরি হারান। মালিকপক্ষ পুরো বেতনও দেয়নি। এদিকে ভাড়া দিতে না পারায় যে বাসায় সাবলেট থাকতেন, সেখান থেকেও বের করে দেওয়া হয় তাকে। সারাদিন না খেয়ে ঘাটে বসে ছিলেন তিনি। ফোন বন্ধ হয়ে গেছে, পরিচিতদের কাছ থেকেও পাননি কোনো সাহায্য।
নীলার কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রহিম উদ্দিন। নিজের ছোটবেলায় মারা যাওয়া মেয়ের কথা মনে পড়ে যায় তার। তিনি নীলাকে নিয়ে যান ঘাটের পাশের একটি ছোট হোটেলে। সেখানে গরম খিচুড়ি ও ডিম ভাজি খেতে দেন। ক্ষুধার্ত নীলা প্রথমে সংকোচ বোধ করলেও পরে খেতে শুরু করেন।
রাত হয়ে যাওয়ায় এবং একা থাকা নিরাপদ নয় বুঝতে পেরে রহিম মিয়া তাকে নিজের বাসায় থাকার প্রস্তাব দেন। তিনি জানান, বাসায় একটি ছোট আলাদা ঘর রয়েছে, চাইলে সেখানেই রাত কাটাতে পারে নীলা। দীর্ঘ দ্বিধার পর রাজি হন তরুণীটি।
রহিম মিয়ার বাসাটি ছিল খুবই সাধারণ। টিনের চাল, পুরনো আসবাব আর দেয়ালে ঝুলছিল তার মৃত স্ত্রীর ছবি। ঘরে ঢুকেই তিনি নীলাকে আশ্বস্ত করে বলেন, “তুমি ভয় পাইও না মা, এই ঘরে তুমি নিরাপদে আছো।”
সেই রাতেই নীলা উপলব্ধি করেন, পৃথিবীতে এখনও মানবতা বেঁচে আছে। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে তিনি শুনতে পান পাশের ঘরে রহিম মিয়া নামাজ পড়ছেন এবং আল্লাহর কাছে তার মঙ্গল কামনা করছেন। সেই দৃশ্য তাকে আরও আবেগাপ্লুত করে তোলে।
পরদিন সকাল থেকেই নীলার জন্য কাজ খুঁজতে বের হন রহিম উদ্দিন। পরিচিত কয়েকটি গার্মেন্টস ও দোকানে যোগাযোগ করেন তিনি। এদিকে এলাকায় শুরু হয় নানা ধরনের গুঞ্জন। অনেকে প্রশ্ন তুলতে থাকে, কেন একজন বয়স্ক মানুষ হঠাৎ করে একটি মেয়েকে বাসায় নিয়ে এলেন। কেউ কেউ নেতিবাচক মন্তব্যও করেন।
তবে এসব কথায় কান দেননি রহিম মিয়া। একদিন চায়ের দোকানে বসে শুধু বলেছিলেন, “মানুষ বিপদে পড়লে সাহায্য করা কি এত বড় অপরাধ?”
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীলাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেন। বাসার কাজকর্মে সাহায্য করতেন, রান্না করতেন এবং রহিম মিয়ার খেয়াল রাখতেন। একদিন বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন রহিম মিয়া। সেদিন সারারাত জেগে থেকে তার সেবা করেন নীলা। ওষুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে কপালে পানি দেওয়া— সবই করেন আন্তরিকভাবে।
কয়েক মাস পর অবশেষে কাছের একটি গার্মেন্টসে চাকরি পান নীলা। প্রথম বেতন হাতে পেয়ে রহিম মিয়ার জন্য একটি সাদা পাঞ্জাবি কিনে আনেন তিনি। উপহারটি হাতে নিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি রহিম মিয়া। তিনি বলেন, “আমারে কেউ শেষ কবে কিছু কিনে দিছে, মনেই নাই।”
ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও মায়ার সম্পর্ক। এক সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বসে রহিম মিয়া নীলাকে নতুন জীবন শুরু করার প্রস্তাব দেন। তিনি জানান, নীলা পাশে থাকলে তার একাকী জীবনটা হয়তো সহজ হয়ে উঠবে।
নীলাও সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানান। পরে ছোট পরিসরে স্থানীয় মসজিদের ইমামের মাধ্যমে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। যারা একসময় সমালোচনা করেছিলেন, তারাই পরে এই সম্পর্ককে “মানবিক ভালোবাসার উদাহরণ” হিসেবে উল্লেখ করেন।
বর্তমানে ছোট্ট সেই টিনের ঘরটিতে আবার ফিরে এসেছে প্রাণের উষ্ণতা। সকালে নীলা টিফিন গুছিয়ে দেন, আর রহিম মিয়া রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন জীবিকার সন্ধানে। রাতে ঘরে ফিরে দরজা খুলতেই তিনি দেখতে পান হাতে গরম চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নীলা।
স্থানীয়দের ভাষায়, এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়— মানবতা এখনও হারিয়ে যায়নি। জীবন যত কঠিনই হোক, কখনও কখনও একজন মানুষের সামান্য সহানুভূতিই বদলে দিতে পারে আরেকজনের পুরো জীবন।