ঢাকা, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬,
সময়: ০৮:৫৫:৪৪ AM

সচিবালয়ে এখনও সক্রিয় পুরোনো সিন্ডিকেট

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
17-05-2026 08:30:28 PM
সচিবালয়ে এখনও সক্রিয় পুরোনো সিন্ডিকেট

রাজধানীর প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে আবারও নানা ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কিছু বিতর্কিত সাংবাদিক, তদবিরকারক ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর আনাগোনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা কয়েকটি চক্র নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে প্রশাসনের ভেতরেই। সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কিছু মুখের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এদের মধ্যে রয়েছেন কিছু কথিত সাংবাদিক, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে তদবির বাণিজ্য, প্রভাব খাটানো এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা আদায়ের অভিযোগ ছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব ব্যক্তির অনেকেই বিগত সরকারের সময় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় সচিবালয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছুদিন তারা আড়ালে থাকলেও সম্প্রতি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, “৫ আগস্টের আগে কিছু নামধারী সাংবাদিক সচিবালয়ে প্রভাব বিস্তার করে চলাফেরা করতেন। বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে তদবির করতেন, বদলি, নিয়োগ ও ঠিকাদারি সংক্রান্ত বিষয়েও তারা সক্রিয় ছিলেন। ৫ আগস্টের পর প্রায় দেড় বছর তারা অনেকটাই আড়ালে ছিলেন। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস না যেতেই আবার তাদের তৎপরতা বাড়তে শুরু করেছে।”

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কিছু ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অবাধে প্রবেশ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা বলে প্রভাব বিস্তার করছেন। এতে প্রশাসনের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

সচিবালয়ের এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী জানান, মন্ত্রীদের আশপাশে থাকা কিছু বেসরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা অনানুষ্ঠানিক সহকারীরা এসব বিতর্কিত সাংবাদিকদের মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করানোর নামে অনেকেই এখন দালালি করছে। কিছু সাংবাদিককে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরপর তারা বিভিন্ন ফাইল, নিয়োগ বা ব্যবসায়িক বিষয় নিয়ে তদবির শুরু করছে।”

অভিযোগ রয়েছে, সচিবালয়কেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের একটি সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, কথিত সাংবাদিক এবং বাইরের প্রভাবশালী মহলের যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক সূত্র। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব খাটিয়ে সুযোগ-সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচিবালয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রবেশ করা অনেকের প্রকৃত কাজ সংবাদ সংগ্রহ নয়; বরং বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হয়ে তদবির করা। কেউ কেউ আবার নিজেদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগেরও চেষ্টা করছেন। এতে প্রকৃত সাংবাদিকতার পরিবেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

একাধিক সূত্র জানায়, সম্প্রতি কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে এসব বিতর্কিত সাংবাদিকদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বৈঠক কিংবা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। এ নিয়ে সচিবালয়ের ভেতরে আলোচনা-সমালোচনাও শুরু হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এ ধরনের সম্পর্ক ভবিষ্যতে প্রশাসনে অস্বচ্ছতা ও অনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।

তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। কারণ হিসেবে অনেকেই প্রশাসনিক চাপ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, অতীতেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলে অনেকে সমস্যায় পড়েছেন। তাই এখনো অনেকে নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

সুশাসন ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সচিবালয়ে কারা প্রবেশ করছেন এবং কী উদ্দেশ্যে নিয়মিত যাতায়াত করছেন—সেটি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে তদবির বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তদন্ত করা দরকার। অন্যথায় প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সচিবালয় রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে যেকোনো ধরনের অনিয়ন্ত্রিত তদবির, প্রভাব বাণিজ্য কিংবা সিন্ডিকেট কার্যক্রম পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বর্তমানে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে যে পরিস্থিতির কথা বিভিন্ন মহল থেকে উঠে আসছে, তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পুরোনো সিন্ডিকেট সংস্কৃতি আবারও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।