ঢাকা, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬,
সময়: ০৪:৫৮:৫৭ PM

”নিহারিকা”

মান্নান মারুফ
13-05-2026 01:46:15 PM
”নিহারিকা”

পর্ব-৩

কুদ্দুস ও নিহারিকার ভালবাসা ছিল অফুরন্ত...”

সময় অদ্ভুতভাবে মানুষকে বদলে দেয়।
একসময় যে বিকেলগুলো অপেক্ষায় কাটত, সেগুলো ধীরে ধীরে ব্যস্ততায় হারিয়ে যায়। জীবন নিজের নিয়মে এগোতে থাকে। নতুন মানুষ আসে, নতুন দায়িত্ব জন্ম নেয়। তবুও কিছু নাম থাকে, যেগুলো সময়ের ভিড়েও মনের এক গোপন জায়গায় নিঃশব্দে বেঁচে থাকে।

কুদ্দুস আর নিহারিকার সম্পর্কও তেমন হয়ে উঠেছিল।

ঢাকায় যাওয়ার পর কয়েক বছর কেটে গেছে। চিঠির সংখ্যা কমেছে, কথার পরিমাণও কমেছে। এখন আর মাসে মাসে খাম আসে না। কখনো দুই মাস, কখনো তিন মাস পর একটি ছোট্ট চিঠি এসে পৌঁছায়। অথচ সেই অল্প কয়েকটি লাইনের জন্যও কুদ্দুস প্রতিদিন অপেক্ষা করে।

অপেক্ষা করতে করতে মানুষ একসময় অভ্যস্ত হয়ে যায়।
কিন্তু ভুলতে পারে না।

কুদ্দুস এখন কলেজে পড়ানোর কাজ শুরু করেছে। ছোট শহরের সেই নিরিবিলি জীবন এখনও আছে, তবে তার ভেতরের মানুষটা আগের মতো নেই।

প্রতিদিন সকালে ক্লাস নেয়, বিকেলে লাইব্রেরিতে যায়। কিন্তু আগের মতো বইয়ে ডুবে থাকতে পারে না। কখনো কোনো কবিতার লাইন হঠাৎ মনে করিয়ে দেয় নিহারিকাকে।

“তুমি কি আমাকে এখনও মনে রাখো?”

পুরোনো সেই চিঠির লাইনটি প্রায়ই ফিরে আসে।

অন্যদিকে নিহারিকাও বদলে গেছে। ঢাকা শহর তাকে একটু পরিণত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা, নতুন বন্ধুবান্ধব, চারপাশের ব্যস্ততা—সবকিছু মিলিয়ে তার দিনগুলো দ্রুত কেটে যায়।

তবুও কিছু নির্জন রাত আসে, যখন হঠাৎ কালীগঞ্জের সেই লাইব্রেরির কথা মনে পড়ে।

মনে পড়ে এক চুপচাপ ছেলের কথা, যে খুব কম কথা বলত, অথচ তার নীরবতার ভেতরে কেমন এক গভীর মায়া ছিল।

ঈদের আগের সন্ধ্যা।

পুরো শহর আলোয় ভরে গেছে। বাজারে মানুষের ভিড়, দোকানে নতুন কাপড়ের গন্ধ, রাস্তায় শিশুদের হাসি।

কুদ্দুস নিজের ঘরে একা বসে ছিল। বাইরে চাঁদ উঠেছে।

ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ল ডাকপিয়ন।

একটি ছোট্ট খাম।

হাতের লেখা দেখেই কুদ্দুস চিনে ফেলল।

নিহারিকা।

খাম খুলতেই ভেতর থেকে একটি সাদা কার্ড বের হলো।

খুব ছোট্ট করে লেখা—

“ঈদ মোবারক।

কিছু মানুষকে বিশেষ দিনে আলাদা করে মনে পড়ে।

— নিহারিকা”

কুদ্দুস দীর্ঘক্ষণ কার্ডটির দিকে তাকিয়ে রইল।

কী অদ্ভুত! এত মানুষের ভিড়ে থেকেও মেয়েটি তাকে মনে রেখেছে।

সে উত্তর লিখতে বসলো।

অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়েও কিছু লিখতে পারল না। শেষে শুধু লিখল—

“তোমাকেও ঈদের শুভেচ্ছা।

বিশেষ দিনগুলোতে কিছু শূন্যতা আরও বেশি বোঝা যায়।”

চিঠিটা পোস্ট করার পরও তার মনে হচ্ছিল, অনেক কিছু বলা হয়নি।

কিন্তু কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো ভাষায় সম্পূর্ণ হয় না।

এক বর্ষার দুপুরে লাইব্রেরির পুরোনো তাক গোছাতে গিয়ে কুদ্দুস একটি বইয়ের ভাঁজে কাগজ খুঁজে পেল।

বইটি ছিল রূপসী বাংলা।

যে বইটি প্রথম দিন নিহারিকার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল।

কাগজটি খুলতেই সে থমকে গেল।

সুন্দর হাতের লেখায় লেখা—

“সব কথা মুখে বলতে নেই। কিছু কথা নীরব থাকলেই সুন্দর।”

নিচে কোনো নাম নেই।

তবুও কুদ্দুস বুঝল, এটা নিহারিকারই লেখা।

হয়তো অনেক আগে বইয়ের ভেতরে রেখে গিয়েছিল।

হয়তো ভুলে গেছে।

অথবা হয়তো ইচ্ছে করেই রেখে গেছে।

সেদিন হঠাৎ কুদ্দুসের খুব ইচ্ছে হলো ঢাকায় চলে যেতে। একবার শুধু সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে—

“তুমি কি সত্যিই আমাকে মনে রাখো?”

কিন্তু সে যায়নি।

কারণ ভালোবাসার মতো কিছু কিছু সম্পর্কের ভেতরে ভয়ও থাকে।

হঠাৎ যদি উত্তর বদলে যায়?

নিহারিকার জীবনেও তখন এক ধরনের টানাপোড়েন চলছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের আড্ডায় মাঝে মাঝে প্রেমের গল্প উঠত। কেউ কারও হাত ধরে ঘুরে বেড়াত, কেউ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত।

নিহারিকা চুপ করে শুনত।

তার কখনো মনে হতো না, সে একা।

কারণ তার ভেতরে কেউ একজন ছিল।

খুব নীরবে।

খুব গভীরে।

একদিন রাতে অনেক সাহস করে সে কুদ্দুসের নম্বর ডায়াল করেছিল।

ফোন বেজে উঠছিল।

একবার।

দু’বার।

তিনবার।

ঠিক তখনই তার বুক কেঁপে উঠল। হঠাৎ কল কেটে দিল।

কী বলবে সে?

এতদিন পর?

“কেমন আছো?”

নাকি—

“তুমি কি এখনও আমাকে ভালোবাসো?”

ফোনটা টেবিলে রেখে সে জানালার বাইরে তাকাল।

ঢাকার আকাশে তখন হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল।

তার মনে হচ্ছিল, কিছু সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এই না-বলা অনুভূতিগুলোতেই।

অন্যদিকে ঠিক সেই রাতেই কুদ্দুসের ফোনে একটি মিসড কল আসে।

অচেনা নম্বর।

কিন্তু কেন যেন তার মনে হলো, এটি নিহারিকারই কল।

অনেকক্ষণ ফোনটির দিকে তাকিয়ে ছিল সে।

ফিরে কল করবে কি না ভেবেছিল।

কিন্তু করেনি।

যদি ভুল হয়?

অথবা যদি সত্যিই নিহারিকা হয়, তাহলে এতদিন পর কী বলবে?

মানুষ কখনো কখনো নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির কাছেই সবচেয়ে বেশি সংকোচ বোধ করে।

দিন কেটে যাচ্ছিল।

তাদের মধ্যে যোগাযোগ কমছিল, কিন্তু অনুভূতি কমছিল না।

বরং না-বলা কথাগুলো আরও গভীর হয়ে জমছিল মনের ভেতরে।

কুদ্দুস মাঝে মাঝে ভাবত—

“নিহারিকা কি এখনও আমাকে মনে রাখে?”

ঠিক একই প্রশ্ন কোনো কোনো গভীর রাতে নিহারিকার মনেও জেগে উঠত—

“কুদ্দুস কি এখনও আমার কথা ভাবে?”

কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করেনি।

কেউ উত্তরও জানত না।

তবুও অদ্ভুতভাবে দু’জন মানুষ একে অপরকে বয়ে নিয়ে চলছিল নিজের অন্তরের ভেতর।

নিঃশব্দে।

দূরত্বের ওপার থেকেও।

কারণ কিছু ভালোবাসা থাকে, যেগুলোর কোনো ঘোষণা লাগে না।

সেগুলো শুধু মানুষের ভেতরে থেকে যায়—শ্বাস প্রশ্বাসের মতো, স্মৃতির মতো, কিংবা বহুদিন আগের কোনো কবিতার লাইনের মতো।

চলবে........