ঢাকা, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬,
সময়: ০৫:০৫:০২ PM

বাগানবাড়ি

মান্নান মারুফ
08-05-2026 02:07:09 PM
বাগানবাড়ি

পঞ্চম পর্ব 

বর্ষার রাতগুলো কেমন যেন বেশি নিঃসঙ্গ হয়। আকাশভরা কালো মেঘ, অবিরাম বৃষ্টির শব্দ আর চারপাশের নিস্তব্ধতা মানুষের ভেতরের কষ্টগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। সেই রাতেও ঠিক তেমনই বৃষ্টি পড়ছিল। বিদ্যুতের আলো মাঝে মাঝে অন্ধকার আকাশ চিরে ঝলসে উঠছিল। শহরের ব্যস্ততা অনেক আগেই থেমে গেছে। শুধু বৃষ্টির শব্দ যেন পৃথিবীর সমস্ত কান্না হয়ে ঝরছিল।

সেই গভীর রাতে ভিজতে ভিজতে হাঁটছিল কুদ্দুস।

তার গায়ে পুরোনো মলিন কাপড়, চুল-দাড়ি এলোমেলো, চোখদুটো গভীর ক্লান্তিতে ডুবে গেছে। অনেকদিন ঠিকমতো খাওয়া হয়নি। শরীরটাও আর আগের মতো চলতে চায় না। তবুও সে হাঁটছিল।

কারণ, আজ তার মন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল এক পুরোনো জায়গায়।

তার ভালোবাসার বাগানবাড়িতে।

যে বাড়ির প্রতিটি ইট একসময় সে স্বপ্ন দিয়ে সাজিয়েছিল। যে বাড়ি সে নিজের হাতে অনামিকার নামে লিখে দিয়েছিল। সেই বাড়ির কথা আজও তার ভেতরে কোথাও বেঁচে ছিল।

বৃষ্টির পানিতে রাস্তা কাদায় ভরে গেছে। মাঝে মাঝে কুদ্দুস হোঁচট খাচ্ছিল। কিন্তু থামছিল না। তার ঠোঁট কাঁপছিল। কখনও বিড়বিড় করে কিছু বলছিল, কখনও শূন্য চোখে সামনে তাকিয়ে হাঁটছিল।

হয়তো তার ভাঙা স্মৃতিগুলো তাকে পথ দেখাচ্ছিল।

রাত তখন প্রায় বারোটা।

দূরে বাগানবাড়ির গেটটা দেখা যায়। বিদ্যুতের আলোয় মুহূর্তের জন্য বাড়িটা ঝলসে ওঠে। কুদ্দুস থেমে যায়।

তার চোখদুটো স্থির হয়ে থাকে বাড়িটার দিকে।

মনে পড়ে যায় বহু পুরোনো কিছু দৃশ্য।

সেই প্রথম দিন, যখন অনামিকা গোলাপবাগানের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল
আপনার বাড়িটা স্বপ্নের মতো সুন্দর।

মনে পড়ে যায় দলিলে স্বাক্ষর করার দিনটা।

মনে পড়ে যায় অনামিকার হাসি।

আর তারপরই মনে পড়ে সেই ভয়ংকর সন্ধ্যা, যখন সে শুনেছিল
আমি কখনোই আপনাকে ভালোবাসিনি।

কুদ্দুসের বুকের ভেতর হঠাৎ তীব্র ব্যথা ওঠে।

সে ধীরে ধীরে গেট ঠেলে ভেতরে ঢোকে।

বাগানবাড়িটা এখন অনেক বদলে গেছে। আগের মতো যত্ন নেই কোথাও। অনেক ফুলগাছ শুকিয়ে গেছে। পুকুরের পানি কালচে হয়ে উঠেছে। তবুও কিছু গোলাপ এখনো বেঁচে আছে।

কুদ্দুস কাঁপা হাতে একটি গোলাপ ছুঁয়ে দেয়।

তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।

—“তুই এখনো বেঁচে আছিস?”

বৃষ্টির ফোঁটা তার মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল।

ঠিক তখন বাড়ির ভেতর থেকে আলো জ্বলে ওঠে।

অনামিকা ঘুম ভেঙে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। বাইরে একজন মানুষকে দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই চিনতে পারে।

কুদ্দুস।

তার বুক ধক করে ওঠে।

এতদিন পরও এই মানুষটা যেন তার জীবনের অদৃশ্য ছায়া হয়ে আছে।

অনামিকা দ্রুত দরজা খুলে বাইরে আসে।

কুদ্দুস তখন বাড়ির সিঁড়ির পাশে বসে আছে। শরীর কাঁপছে ঠান্ডায়। চোখদুটো আধবোজা।

অনামিকা কাঁপা গলায় বলে,
—“
আপনি এখানে কেন?”

কুদ্দুস ধীরে ধীরে মাথা তোলে।

তার চোখে অদ্ভুত শূন্যতা।

মৃদু স্বরে বলে,
—“
আমি বাড়ি দেখতে এসেছি।

অনামিকার বুকের ভেতর কষ্টের ঢেউ ওঠে।

এই মানুষটা একসময় কত গর্ব করে বলত
এই বাড়ি তোমার।

আর আজ সেই মানুষটাই নিজের বাড়ির সামনে আশ্রয়হীন পথিকের মতো বসে আছে।

অনামিকা বলল,
—“
আপনি পুরো ভিজে গেছেন। ভেতরে আসুন।

কুদ্দুস মৃদু হেসে মাথা নাড়ে।

—“নাআমি ভেতরে যাওয়ার অধিকার হারিয়েছি।

কথাটা শুনে অনামিকার চোখ পানি চলে আসে

সে বুঝতে পারে, কুদ্দুস পাগল হয়ে গেলেও তার হৃদয়ের গভীরে সবকিছু রয়ে গেছে।

বৃষ্টি আরও জোরে নামতে থাকে।

কুদ্দুস ধীরে ধীরে দরজার সামনে এসে বসে পড়ে। যেন বহুদিনের ক্লান্ত মানুষ শেষ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।

অনামিকা কয়েকবার তাকে ভেতরে নিতে চাইল।

কিন্তু কুদ্দুস শুধু একটাই কথা বলল
—“
আমি এখানেই ভালো আছি।

তারপর দেয়ালের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে চুপ হয়ে যায়।

অনামিকা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তার ভেতরে অদ্ভুত অপরাধবোধ কাজ করতে ছিল

একসময় সে সত্যিই কুদ্দুসকে ব্যবহার করেছে।

নিজের স্বার্থের জন্য একজন মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে ভেঙে দিয়েছিল।

আজ সেই মানুষটা ভাঙা শরীর নিয়ে তার দরজার সামনে পড়ে আছে।

অনামিকার মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন তাকে অভিশাপ দিচ্ছে।

রাত আরও গভীর হয়।

দূরে বজ্রপাতের শব্দ শোনা যায়।

কুদ্দুস তখন আধচেতন অবস্থায় বিড়বিড় করছে।

—“অনামিকাফুলগুলোতে পানি দিও…”

তার কণ্ঠ খুব দুর্বল।

অনামিকার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।

সে প্রথমবার অনুভব করে, ভালোবাসা নিয়ে প্রতারণা করা শুধু একটি মানুষকে ধ্বংস করে নাধ্বংস করে অনেকগুলো জীবন।

হঠাৎ কুদ্দুস কাশতে শুরু করে।

তার শরীর কাঁপছিল প্রবলভাবে।

অনামিকা ভয় পেয়ে যায়।

সে দ্রুত এগিয়ে এসে কুদ্দুসের কপালে হাত রাখে।

শরীর জ্বরে পুড়ছে।

অনামিকা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
—“
আপনি এমন করলেন কেন নিজের সঙ্গে?”

কুদ্দুস মৃদু চোখ খুলে তাকায়।

অনেক কষ্টে বলে,
—“
ভালোবাসা মানুষকে বাঁচায়ওআবার মেরেও ফেলে।

এই কথাটা শুনে অনামিকা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।

সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

কিন্তু কিছু কান্না থাকে, যেগুলো খুব দেরিতে আসে।

কুদ্দুস ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে পড়তে থাকে।

অনামিকা আতঙ্কিত হয়ে লোক ডাকতে যায়। বাড়ির কর্মচারীরা ছুটে আসে। সবাই মিলে কুদ্দুসকে উঠানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু তার শরীর তখন প্রায় নিস্তেজ।

একসময় যে মানুষটা এই বাড়ির মালিক ছিল, আজ তাকে দরজার সামনে পড়ে থাকতে দেখে সবার বুক ভারী হয়ে ওঠে।

একজন কর্মচারী ফিসফিস করে বলল,
—“
স্যার কত ভালো মানুষ ছিলেন…”

আরেকজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—“
ভালো মানুষরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়।

অনামিকা তখন কুদ্দুসের মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছে।

তার চোখে আতঙ্ক, অনুশোচনা আর অসহায়তা।

সে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল,
—“
চোখ খুলুনপ্লিজ…”

কিন্তু কুদ্দুস আর সাড়া দিচ্ছিল না।

দূরের আকাশে আবার বিদ্যুৎ চমকে ওঠে।

বাগানবাড়ির পুরোনো গোলাপগাছগুলো বাতাসে দুলছিল।

মনে হচ্ছিল, তারাও যেন এই দৃশ্য দেখে কাঁদছে।

হঠাৎ কুদ্দুস খুব আস্তে চোখ খুলে।

তার দৃষ্টি অস্পষ্ট।

সে দরজার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলে,
—“
আমি কিএকটু ঘুমাতে পারি?”

অনামিকা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ে।

কুদ্দুসের ঠোঁটে তখন অদ্ভুত শান্তির হাসি।

হয়তো দীর্ঘদিন পর সে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জায়গাটিতে ফিরে এসেছে।

তারপর ধীরে ধীরে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে।

বৃষ্টির শব্দ আরও ভারী হয়ে ওঠে।

সেই রাতের অন্ধকারে বাগানবাড়ির দরজার সামনে পড়ে থাকে এক হৃদয় ভাঙা মানুষযে একসময় ভালোবেসে নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছিল।

আর অনামিকা তখন বসে থাকে তার পাশে, নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় পাপের মুখোমুখি হয়ে।

কারণ, কিছু ভুলের ক্ষমা হয় না।

কিছু ভালোবাসার মৃত্যু মানুষের জীবনভর অভিশাপ হয়ে বেঁচে থাকে।

চলবে.....