শেষ পর্ব
রাত তখন প্রায় শেষের দিকে। আকাশের বৃষ্টি ধীরে ধীরে কমে এসেছে, কিন্তু বাতাসে এখনো ভেজা মাটির গন্ধ। চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু দূরে কোথাও ব্যাঙের ডাক আর গাছের পাতায় জমে থাকা পানির টুপটাপ শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
বাগানবাড়ির দরজার সামনে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল কুদ্দুস।
অনামিকা তার মাথা কোলে নিয়ে বসেছিল। চোখদুটো কান্নায় ফুলে গেছে ততক্ষনে। এত বছর পর এই প্রথম সে নিজের ভেতরে ভয়ংকর শূন্যতা অনুভব করছিল। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত অপরাধ যেন একসঙ্গে তার বুকে চেপে বসেছে।
একসময় যে মানুষটা তার হাসির জন্য পৃথিবী উজাড় করে দিয়েছিল, আজ সেই মানুষটাই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে তার দরজার সামনে।
কর্মচারীরা দ্রুত একজন ডাক্তার ডাকতে যায়। কিছুক্ষণ পর গ্রামের বৃদ্ধ ডাক্তার এসে কুদ্দুসকে পরীক্ষা করেন। অনেকক্ষণ চুপ থেকে তিনি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
—“অবস্থা খুব খারাপ।”
অনামিকার বুক কেঁপে ওঠে।
—“বাঁচবে তো?”
ডাক্তার কোনো উত্তর দেন না। শুধু ধীরে মাথা নিচু করেন।
এই নীরব উত্তরই যেন সবকিছু বলে দেয়।
কুদ্দুসের শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘদিনের অনাহার, অবহেলা আর মানসিক যন্ত্রণা তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিয়েছিল। তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল।
তবুও মাঝে মাঝে সে চোখ খোলার চেষ্টা করছিল।
হয়তো কিছু বলতে চাইছিল।
অনামিকা কাঁপা হাতে তার কপালে হাত রাখে।
—“কুদ্দুস… শুনতে পাচ্ছেন?”
কুদ্দুস খুব আস্তে চোখ খুলে তাকায়।
সেই চোখে আর কোনো অভিযোগ ছিল না। ছিল শুধু গভীর ক্লান্তি।
মৃদু স্বরে বলল,
—“বৃষ্টি থেমেছে?”
অনামিকা চোখের পানি মুছে বলল,
—“হ্যাঁ… থেমে গেছে।”
কুদ্দুস দুর্বল হাসল।
—“ভালো… ফুলগুলো বাঁচবে।”
এই অবস্থাতেও সে নিজের কথা ভাবেনি। ভাবছিল তার বাগানের ফুলগুলোর কথা।
অনামিকার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।
সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
কুদ্দুস কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর খুব ধীরে বলে,
—“ক্ষমা? মানুষ তো ভুল করেই…”
অনামিকা মাথা নিচু করে ফেলে।
এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছিল, সে পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট মনের মানুষ।
যে মানুষটা সব হারিয়েও তাকে দোষ দিচ্ছে না, সেই মানুষটার সঙ্গে সে ভয়ংকর অন্যায় করেছে।
দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। রাত শেষ হয়ে ভোর নামছে।
কুদ্দুসের চোখ আধবোজা হয়ে আসে। কিন্তু তার ঠোঁট নড়ছিল।
অনামিকা কান কাছে নিয়ে যায়।
কুদ্দুস ফিসফিস করে বলছিল,
—“আমি শুধু একটু ভালোবাসা চেয়েছিলাম…”
এই কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই নিঃশব্দ হয়ে যায়।
কারণ, একজন মানুষের সমস্ত জীবনের কষ্ট যেন এই একটি বাক্যের ভেতর জমে ছিল।
কুদ্দুস ধীরে ধীরে অতীতের স্মৃতিগুলো মনে করতে থাকে।
তার মায়ের মুখ।
শৈশবের দিনগুলো।
বাগানবাড়ির প্রথম ইট বসানোর সময়কার আনন্দ।
আর তারপর অনামিকার সেই প্রথম হাসি।
সে মনে মনে ভাবল, কত সহজেই সে বিশ্বাস করেছিল।
ভালোবাসা তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল।
সে বুঝতে পারেনি, সব হাসির পেছনে সত্যিকারের অনুভূতি থাকে না।
কিছু মানুষ ভালোবাসাকে ব্যবহার করে।
কিছু মানুষ হৃদয়কে সিঁড়ি বানিয়ে নিজের স্বার্থ পূরণ করে নেয়।
কুদ্দুসের চোখ দিয়ে ধীরে ধীরে পানি গড়িয়ে পড়ে।
সে ফিসফিস করে বলল,
—“মানুষ এত স্বার্থপর কেন?”
কেউ উত্তর দিতে পারে না।
কারণ, এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো পৃথিবীর কারও জানা নেই।
অনামিকা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
—“আমি ভুল করেছি… অনেক বড় ভুল।”
কুদ্দুস তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করে।
তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল।
তবুও সে খুব শান্ত গলায় বলল,
—“তুমি সুখে থেকো।”
এই কথাটা শুনে অনামিকা যেন ভেঙে পড়ে।
সে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে।
—“না! আপনি আমাকে এভাবে ক্ষমা করবেন না… আমাকে ঘৃণা করুন… অভিশাপ দিন…”
কুদ্দুস দুর্বলভাবে মাথা নাড়ে।
—“ঘৃণা করতে শিখিনি।”
এই মানুষটাই ছিল কুদ্দুস।
ভালোবাসতে জানত, কিন্তু ঘৃণা করতে জানত না।
হয়তো সেই কারণেই পৃথিবী তাকে এত সহজে ভেঙে দিতে পেরেছিল।
ভোরের আলো ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। বাগানবাড়ির ভেজা ফুলগুলোতে শিশির জমে উঠছিল।
কুদ্দুসের নিঃশ্বাস তখন আরও ধীর হয়ে এসেছে।
ডাক্তার চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, সময় খুব কম।
কুদ্দুস হঠাৎ আকাশের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে।
তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।
হয়তো সে জীবনের সমস্ত কষ্ট থেকে মুক্তি অনুভব করছিল।
খুব আস্তে বলল,
—“আমি ক্লান্ত…”
অনামিকা কাঁদতে কাঁদতে তার হাত শক্ত করে ধরে।
কুদ্দুস আবার ফিসফিস করে বলে,
—“জানো অনামিকা… শেষ পর্যন্ত একটা জিনিস বুঝেছি…”
অনামিকা কান্নার ভেতর জিজ্ঞেস করল,
—“কি?”
কুদ্দুস গভীর কষ্টভরা চোখে তাকিয়ে বলল,
—“স্বার্থপর মানুষ ভালোবাসাকেও প্রতারণায় বদলে ফেলে…”
তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে।
—“তারপর মানুষ বেঁচে থাকে… খুব একা হয়ে…”
কথাগুলো শেষ করেই সে কাশতে শুরু করে।
তার হাত ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
অনামিকা আতঙ্কিত হয়ে ডাকতে থাকে,
—“কুদ্দুস! চোখ খুলুন… প্লিজ!”
কিন্তু কুদ্দুস তখন অনেক দূরে চলে যাচ্ছিল।
তার চোখের সামনে হয়তো ভেসে উঠছিল সেই পুরোনো বাগানবাড়ি, যেখানে একসময় সে স্বপ্ন দেখেছিল।
হয়তো সে দেখছিল গোলাপভরা বিকেল।
হয়তো শুনছিল অনামিকার প্রথম হাসি।
একসময় তার ঠোঁটে খুব শান্ত একটা হাসি ফুটে ওঠে।
তারপর ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস থেমে যায়।
সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
বাগানবাড়ির উঠোনে শুধু বাতাস বইছিল।
অনামিকা কিছুক্ষণ বিশ্বাসই করতে পারে না।
তারপর হঠাৎ কুদ্দুসের নিথর শরীর জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে।
সেই কান্নায় ছিল অনুশোচনা, অপরাধবোধ আর সারাজীবনের না-পাওয়া শাস্তি।
কর্মচারীদের অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
কারণ, তারা জানত—কুদ্দুস মানুষটা সত্যিই খুব ভালো ছিল।
এই পৃথিবীতে ভালো মানুষরা অনেক সময় সবচেয়ে বেশি একা হয়ে যায়।
কুদ্দুসের মৃত্যুর খবর ধীরে ধীরে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
যে মানুষটাকে একসময় সবাই সম্মান করত, পরে পাগল বলে এড়িয়ে চলত—তার গল্প এখন মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে।
অনেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
—“ভালোবাসেই মানুষটাকে শেষ করে দিল।”
সিদ্ধান্ত আসে। বাগানবাড়ির উঠোনেই কুদ্দুসকে দাফন করা হয়।
তার প্রিয় গোলাপগাছগুলোর পাশে।
কবরের পাশে অনামিকা প্রতিদিন সেখানে গিয়ে বসে থাকত।
কখনও ফুল ছুঁয়ে কাঁদত, কখনও কবরের পাশে চুপচাপ বসে থাকত।
কিন্তু সময় আর কখনও পেছনে ফেরেনি।
কুদ্দুস আর ফিরে আসেনি।
শুধু তার রেখে যাওয়া ভালোবাসা আর কষ্টের স্মৃতিগুলো বেঁচে ছিল।
আর অনামিকা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছিল—
মানুষের হৃদয় ভাঙার শাস্তি আদালত দেয় না, জীবন দেয়।
কারণ, কিছু পাপ মানুষের আত্মাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়।
আর কুদ্দুস?
সে শেষ নিঃশ্বাসের আগেই বুঝে গিয়েছিল—
স্বার্থপর মানুষ ভালোবাসাকেও নির্মম প্রতারণায় বদলে ফেলে, তারপর রেখে যায় শুধু নিঃসঙ্গ অন্ধকার জীবন।
।।সমাপ্ত।।