ঢাকা, সোমবার, ১১ মে ২০২৬,
সময়: ০৪:৫৩:৪৬ PM

জনসেবা ও উন্নয়নের বাজেটের খোঁজে সরকার

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
11-05-2026 03:03:03 PM
জনসেবা ও উন্নয়নের বাজেটের খোঁজে সরকার

বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংক খাতের চাপের মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় এই বাজেটকে ঘিরে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতির ভেতরের বাস্তব সংকট সরকারকে ফেলেছে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। সূত্র অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন আগামী ৭ জুন বিকেল ৩টায় শুরু হতে পারে। এই অধিবেশনে বাজেট উপস্থাপন ও পাস করার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে পারেন বলে অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি।

একসঙ্গে বহু সংকটের চাপ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এবারের বাজেট প্রণয়নে সরকারকে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান–ইসরায়েল বিরোধ ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খরচ এবং শিল্প উৎপাদন ব্যয়ের ওপর পড়ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–এর ঋণ কর্মসূচির শর্ত বাস্তবায়ন নিয়েও সরকার চাপের মধ্যে রয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এবারের বাজেট হবে একই সঙ্গে “জনমুখী এবং বাস্তবসম্মত”, তবে এটিকে দেশের অন্যতম “সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বাজেট” হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানোর লক্ষ্য

সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো অর্থনীতিতে মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। গত কয়েক বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, জনগণের মধ্যে স্বস্তি না ফিরলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতা

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড–এর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) ওপর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব থাকবে। এনবিআরের জন্য প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এত বড় রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হতে পারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম।

এই পরিস্থিতিতে সরকারকে করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং নতুন খাত থেকে রাজস্ব আহরণের দিকে যেতে হবে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, কর অব্যাহতি হ্রাস, ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং শুল্কহার বাজারভিত্তিক করার বিষয়গুলো বিবেচনায় রয়েছে।

ব্যবসা ও বিনিয়োগে চাপ

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি একাধিক বৈঠকে বলেছেন, অর্থনীতির গতি ফেরাতে ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ জরুরি। ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, ফলে কর্মসংস্থানও কমে যাচ্ছে।

সামাজিক নিরাপত্তায় জোর

সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বড় পরিসরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতার আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানো হবে।

ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৪১ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বয়স্ক ও বিধবা ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হতে পারে।

নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এসব কর্মসূচি নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হবে, তবে এতে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হবে।

ঘাটতি অর্থায়নের ঝুঁকি

বিশাল বাজেটের বিপরীতে ঘাটতি ধরা হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ, সঞ্চয়পত্র এবং ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়বে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ বাড়াবে। ইতিমধ্যে আগামী বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জ্বালানি সংকট ও ভর্তুকি চাপ

জ্বালানি খাত এখন সরকারের অন্যতম বড় উদ্বেগের জায়গা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে।

একই সঙ্গে কৃষি খাতে সারের ভর্তুকি অব্যাহত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে, যা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে জটিলতা তৈরি করছে।

উন্নয়ন ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য

আগামী বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা হতে পারে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের সেবা সম্প্রসারণ, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সরকার দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর জন্য শিল্পায়ন, রপ্তানি, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

অর্থনীতিবিদ মাহবুব আহমেদ মনে করেন, রাজস্ব সক্ষমতা না বাড়িয়ে অতিরিক্ত ব্যয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

ড. জাহিদ হোসেন–এর মতে, জ্বালানি সংকট সমাধান এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে গবেষণা সংস্থা সিপিডি–এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নিত্যপণ্যের ওপর কর হ্রাস স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিতে পারে, তবে বাজার ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে তার সুফল সীমিত হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সব মিলিয়ে এবারের বাজেট শুধু একটি আর্থিক পরিকল্পনা নয়, বরং একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের চেষ্টা। সংকট, চাপ এবং প্রত্যাশার এই সমন্বয়ে সরকারকে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট দিতে হবে, যা একদিকে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।