ঢাকা, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০২:৪১:৪৬ PM

উপন্যাস: সেই মেয়েটি

মান্নান মারুফ
23-03-2026 12:57:10 PM
উপন্যাস: সেই মেয়েটি

পর্ব-৭

সময় কখন যে মানুষের জীবনে নিঃশব্দে তার শিকড় গেঁড়ে বসে, তা কেউ বুঝতে পারে না। নীল আর কুদ্দুছের জীবনেও তেমনই হয়েছিল। দিন পেরিয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ পেরিয়ে মাস, আর মাস গড়িয়ে বছর—তারা কথা বলেই যাচ্ছিল। যেন কথাই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

প্রথমে যে কথাগুলো ছিল লাজুক, সংকোচভরা—ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠলো অভ্যাস। আর সেই অভ্যাস একসময় রূপ নিলো গভীর নির্ভরতায়। এখন এমন অবস্থা, একদিন কথা না বললে দুজনেরই যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।

রাতের পর রাত কেটে যায় তাদের কথা বলতে বলতে। কখনো হাসি, কখনো অভিমান, কখনো নিরবতা—সবকিছু মিলে এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এমন সম্পর্ক, যার কোনো নাম নেই, কোনো নিশ্চয়তা নেই, তবুও আছে গভীর এক টান।

কুদ্দুছ মাঝারি আয়ের একজন সাধারণ মানুষ। শহরের এক কোণায় ছোট্ট একটা মেসে থাকে। নিজের বলতে কিছু নেই—না বাড়ি, না জমি, না বড় কোনো স্বপ্ন। তবুও তার জীবনে একটা জিনিস ছিল, যা তাকে বাঁচিয়ে রাখত—নীল।

অন্যদিকে নীল… তার জীবনটা ছিল অনেক জটিল। বাইরে থেকে যতটা শান্ত মনে হয়, ভেতরে ততটাই অশান্ত। তার চারপাশে ছিল সামাজিক চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, আর অজানা কিছু ভয়—যা সে কখনো পুরোপুরি কুদ্দুছকে বলেনি।

প্রথমদিকে এসব বিষয় নিয়ে তেমন কথা হতো না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বাস্তবতার ছায়া তাদের সম্পর্কেও পড়তে শুরু করলো।

একদিন রাতে কথা বলার সময় নীল হঠাৎ বলল,
—একটা কথা বলবো?

—বল,—কুদ্দুছ আগ্রহ নিয়ে বলল।

নীল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমার জন্য একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে।

কুদ্দুছের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো।
—কি বলছো তুমি?

—হ্যাঁ… বাসায় সবাই খুব আগ্রহী। ছেলেটা নাকি ভালো চাকরি করে, পরিবারও ভালো…

কুদ্দুছের মনে হচ্ছিল, তার চারপাশের সবকিছু যেন হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেছে।

—তুমি কি বলেছো?—তার গলা শুকিয়ে গেল।

নীল ধীরে বলল,
—আমি কিছু বলিনি।

এই “কিছু বলিনি” কথাটা কুদ্দুছের মনে আরও ভয় ধরিয়ে দিলো।

—তুমি না করে দেবে,—কুদ্দুছ হঠাৎ দৃঢ় গলায় বলল,—তুমি তো জানো, আমরা…

সে বাকিটা বলতে পারলো না।

নীল চুপ করে রইলো।

এই নীরবতাই যেন সব প্রশ্নের উত্তর হয়ে দাঁড়ালো।

—নীল, তুমি কিছু বলছো না কেন?—কুদ্দুছের গলায় আতঙ্ক।

—সবকিছু এত সহজ না, কুদ্দুছ…—নীল আস্তে বলল।

—আমাদের ভালোবাসা কি এতটাই সহজে শেষ হয়ে যাবে?

নীল উত্তর দিলো না।

সেদিন রাতটা দুজনের কাছেই খুব দীর্ঘ ছিল। কথাগুলো শেষ হলেও, না বলা কথাগুলো তাদের বুকের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল।

পরের দিন আবার কুদ্দুছ ফোন করলো।

—নীল, শোনো… আমরা বিয়ে করবো।

নীল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—কিভাবে?

—আর ছয় মাস সময় দাও আমাকে,—কুদ্দুছ বলল,—আমি সব ঠিক করে ফেলবো। একটা ভালো চাকরি নেবো, একটা বাসা নেবো… তারপর আমরা বিয়ে করবো।

নীল মৃদু হেসে বলল,
—ছয় মাসে সব ঠিক হয়ে যাবে?

—হয়ে যাবে,—কুদ্দুছ দৃঢ়ভাবে বলল,—আমি পারবো।

নীল কিছু বললো না। কিন্তু তার চুপ থাকা যেন সম্মতির মতোই লাগছিল।

সেই দিন থেকে কুদ্দুছ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো। সে আরও বেশি পরিশ্রম করতে লাগলো। অতিরিক্ত কাজ নিলো, টাকা জমাতে লাগলো। তার প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত একটাই লক্ষ্য—নীলকে নিজের করে পাওয়া।

কিন্তু সময়… সময় কখনো কারো জন্য থেমে থাকে না।

ছয় মাস পার হয়ে গেল।

কুদ্দুছ একদিন ফোন করে বলল,
—নীল, আর একটু সময় লাগবে… সবকিছু ঠিক হচ্ছে।

—ঠিক আছে,—নীল শান্ত গলায় বলল।

আরও কিছুদিন গেল।

এক বছর পেরিয়ে গেল।

কুদ্দুছ যখনই বিয়ের কথা তুলতো, নীল কোনো না কোনোভাবে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আসতো।

—আজকে অফিসে কি হলো জানো?
—তুমি আজ খেয়েছো তো?
—তোমার শরীরটা কেমন?

এইসব ছোট ছোট কথার আড়ালে যেন বড় একটা সত্য লুকিয়ে থাকতো—যা তারা কেউই স্পষ্ট করে বলতে চাইতো না।

কুদ্দুছ মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যেতো।
—তুমি সবসময় কথা ঘুরিয়ে ফেলো কেন?

নীল হেসে বলত,
—সব কথা সবসময় বলা যায় না।

কুদ্দুছ বুঝতে পারতো না, নীল আসলে কি চায়।

তার মনে হতো, নীল তাকে ভালোবাসে—এটা সত্যি। কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যে যেন একটা ভয় আছে, একটা দূরত্ব আছে।

একদিন রাতে কুদ্দুছ একটু রাগ করেই বলল,
—তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে চাও না?

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর নীল আস্তে বলল,
—চাই…

—তাহলে সমস্যা কোথায়?

—সমস্যা আমি…

এই কথাটা শুনে কুদ্দুছ থেমে গেল।

—মানে?

নীল বলল,
—আমি তোমার জন্য ঠিক না, কুদ্দুছ।

—এইসব বাজে কথা বলো না,—কুদ্দুছ রাগ করে বলল,—আমি জানি আমি কি চাই।

—কিন্তু তুমি জানো না, আমি কে…

এই কথার মধ্যে এমন একটা রহস্য ছিল, যা কুদ্দুছকে আরও বিভ্রান্ত করে দিল।

—তুমি আমার নীল,—সে শান্তভাবে বলল,—এইটাই আমার কাছে যথেষ্ট।

নীল হালকা হেসে বলল,
—তুমি সত্যিই খুব সরল।

কুদ্দুছ উত্তর দিলো,
—হ্যাঁ… কারণ আমি ভালোবাসতে শিখেছি।

কিন্তু ভালোবাসা কি সবসময় যথেষ্ট হয়?

সময়ের সাথে সাথে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো, কিন্তু সেই গভীরতার মধ্যেই জন্ম নিলো এক অদ্ভুত অস্থিরতা।

কুদ্দুছ দিন দিন আরও অস্থির হয়ে উঠছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন ধীরে ধীরে নীলকে হারিয়ে ফেলছে—কিন্তু ঠিক কিভাবে, সেটা সে বুঝতে পারছে না।

আর নীল…

সে প্রতিদিন নিজেকে ভেঙে ফেলছিল।

একদিকে কুদ্দুছের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন দেয়াল—এই দুইয়ের মাঝে সে যেন আটকে গেছে।

কখনো কখনো সে ফোন কেটে দিয়ে চুপচাপ কাঁদতো।

নিজেকেই বলতো,
—এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই…

তবুও পরের দিন আবার ফোন করতো, আবার কথা বলতো, আবার হাসতো—ঠিক যেন কিছুই হয়নি।

এভাবেই দিন গড়িয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু তাদের অজান্তেই সময় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল।

যে সিদ্ধান্ত একদিন তাদের জীবন পুরোপুরি বদলে দেবে।

এক রাতে কুদ্দুছ হঠাৎ বলল,
—নীল, আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না।

—আর একটু সময় দাও…

—কতদিন?

নীল চুপ করে রইলো।

এই চুপ থাকাটাই যেন সবচেয়ে ভয়ংকর উত্তর।

কুদ্দুছ বুঝতে পারছিল, কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে।

কিন্তু কি?

ভালোবাসা… নাকি বিশ্বাস?

রাতের আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে।
নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—সব ভালোবাসার শেষ এক হয় না, কুদ্দুছ…

কুদ্দুছ কিছু শুনতে পেল না।

কিন্তু ভবিষ্যৎ… যেন সেই কথাটাই নীরবে লিখে রাখলো।

চলবে…