ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ১০:২২:৫০ PM

কীভাবে চেয়ার ধরে আছেন শাহনেওয়াজ?

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
28-09-2026 08:00:31 PM
কীভাবে চেয়ার ধরে আছেন শাহনেওয়াজ?

দেশের চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম ও অবৈধ নিয়োগসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের কয়েকটি তদন্তে উঠে এসেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজের বক্তব্য ভিন্ন এবং তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিভিন্ন অংশের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ৯ সেপ্টেম্বর জিটিসিএলের এমডি পদ থেকে শাহনেওয়াজ পারভেজকে তিতাস গ্যাসের এমডি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর নিয়োগকে কেন্দ্র করে তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দেখা দেয়। ওই পরিস্থিতিতে সেনা প্রহরায় তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি তাঁর পেট্রোবাংলায় নিয়োগ নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি সহকারী প্রকৌশলী (পেট্রোলিয়াম) পদে নিয়োগ পান। ভারতের ইন্ডিয়ান স্কুল অব মাইনস, ধানবাদ থেকে অর্জিত তাঁর বিটেক ডিগ্রির সমতা বা অ্যাক্রিডিটেশন সনদও নিয়োগের সময় জমা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট নথি, রেকর্ডপত্র, লিখিত জবাব ও বক্তব্য পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে নিয়োগের সময় তাঁর বিদেশি ডিগ্রির সমতা নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তবে শাহনেওয়াজ পারভেজের দাবি, পেট্রোবাংলার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেই লিখিত/মৌখিক পরীক্ষার কথা উল্লেখ ছিল এবং বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, তাঁর চার বছর মেয়াদি বিটেক ইন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমতুল্য।

তাঁর দীর্ঘদিন পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ২৩ বছর একই বিভাগে দায়িত্ব পালনের ফলে তিনি একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেন। অফশোর বিডিং, বিভিন্ন চুক্তি এবং বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে।

তিতাসে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় প্রায় ১৫০টি নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম ও ঘুষের মাধ্যমে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৫০০ অবৈধ সংযোগ থেকে প্রতি মাসে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে। এসব আর্থিক দাবির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

তিতাসের আওতাধীন বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অবৈধ বাইপাস লাইন ব্যবহার এবং গ্যাসের চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্যাসের চাপ কমিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের চাপ বাড়ানো হতো। একইভাবে বকেয়া গ্যাস বিল কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে শাহনেওয়াজ পারভেজ এসব অভিযোগের ব্যাখ্যায় বলেছেন, গ্যাস বিপণন নীতিমালা ২০১৪-এর ৮.৫.২ ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বকেয়া বিল কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। গ্রাহকের আবেদনের ভিত্তিতে বকেয়া আদায় এবং শ্রমিক অসন্তোষ এড়ানোর স্বার্থে কেস-টু-কেস ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে তাঁর বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী পেট্রোবাংলা ও বিভিন্ন কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে ১৬টি অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নিয়োগে অনিয়ম, সিনিয়রিটি লঙ্ঘন, অবৈধ শিল্প সংযোগ, বিভিন্ন কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম, কর্মকর্তাদের হয়রানি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে একই কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব দেওয়ার মতো বিষয়।

২০২৬ সালের ১১ মার্চ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে আরও একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এতে পূর্বের অভিযোগের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ ফেরত, একটি বিদেশি কোম্পানিকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, সিস্টেম লসের নামে গ্যাস চুরি, গ্যাস রেশনিং, একাধিক পদে একই কর্মকর্তার দায়িত্ব এবং সার্ভিস লাইন বন্ধ করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ যুক্ত করা হয়।

এসব অভিযোগের মধ্যেই দেশে গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতির কারণে আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি শিল্পকারখানাও সমস্যায় পড়ছে। তিতাসের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় একটি সময় গ্যাসের চাপ কম থাকার অভিযোগ রয়েছে। পুরোনো পাইপলাইন, লিকেজ, অবৈধ সংযোগ ও সিস্টেম লস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অভিযোগ ও তদন্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে সেসব তদন্তের ফলাফল এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলোর তদন্ত হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই বলে জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেন, নিয়োগসংক্রান্ত রেকর্ড, গ্যাস সংযোগের তথ্য এবং পূর্ববর্তী তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্য যাচাইয়ের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের বক্তব্যের পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তার ব্যাখ্যাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিতাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা, গ্যাস সরবরাহ ও জনস্বার্থের সঙ্গে বিষয়গুলো সরাসরি যুক্ত হওয়ায় অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।