ঢাকা, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৭:১৭ PM

শোকের মহাকাব্য- পর্ব–২০

মান্নান মারুফ
08-01-2026 01:32:58 PM
শোকের মহাকাব্য- পর্ব–২০

(নির্বাচনী তফসিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি দায়বদ্ধতা)

১৯৯৬ সালের শুরুটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছিল উত্তেজনার। ভোট এবং ক্ষমতার লড়াইসবই চলছিল, কিন্তু জনগণের আস্থা দেশের গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, এক সিদ্ধান্ত নিলেন যা শুধু রাজনীতি নয়, গণতান্ত্রিক ইতিহাসেও নজির স্থাপন করল।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর, খালেদা জিয়া দেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছিল। বিরোধী দলসমূহ অভিযোগ করছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে। দেশে ভোটের আস্থা এবং জনগণের বিশ্বাস ফেরত আনাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

একজন দেশের নেতা হিসেবে খালেদা জিয়া জানতেনশুধু ক্ষমতা ধরে রাখাটাই যথেষ্ট নয়; দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করাও তার দায়িত্ব। তাই তিনি এমন পদক্ষেপ নিলেন যা রাজনৈতিক সাহস এবং নৈতিক নেতৃত্বের নিদর্শন হয়ে ইতিহাসে রয়ে যাবে।

পদত্যাগের সিদ্ধান্ত

নির্বাচনকে স্বচ্ছ ন্যায়সঙ্গত করতে, প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন খালেদা জিয়া। এটি ছিল কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের পদক্ষেপ নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের বিশ্বাসকে শক্তিশালী করার জন্য।

একটি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,
গণতন্ত্রের জোরে নির্বাচন হতে হবে। আমি চাই দেশের মানুষ যেন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের ভোট দিতে পারে। এজন্য আমাকে সরকার থেকে পদত্যাগ করতে হবে। এটি আমাদের দেশে গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

এই পদক্ষেপ দেখালএকজন নেতা তার রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন।

প্রতিক্রিয়া সমর্থন

দেশজুড়ে এই পদক্ষেপে মানুষ অবাক, কিন্তু গভীরভাবে প্রশংসা করল। রাজনৈতিক বিরোধীরা বলল,
এটি সত্যিই বিরল নজির। কোনো নেতা নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে হুমকিতে ফেলত না।

সাধারণ মানুষ, যুবক, শিক্ষার্থী, শ্রমিকসবাই এই পদক্ষেপকে গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে দেখল। ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জে, সকলে বলল, আমরা একজন নেত্রীর সত্যিকারের সাহস দেখলাম।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তুতি

খালেদা জিয়ার পদত্যাগের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হলো। তার লক্ষ্য স্পষ্টনির্বাচন স্বচ্ছ নিরপেক্ষ হতে হবে। নতুন সরকার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে, নিরাপদ ভোটকেন্দ্র তৈরি করে এবং বিরোধী দল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

এই প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়া সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। বরং, তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একজন রাজনৈতিক নেতা নিজের ক্ষমতা ক্ষয় না করেই দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্মান জানাতে পারে।

নেতৃত্বের শিক্ষা

এই পদক্ষেপ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখি:

  • গণতন্ত্র শুধু ভোট নয়; এটি দেশের নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্বও দাবি করে।
  • রাজনৈতিক নেতা কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য দেশের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম বা প্রক্রিয়াকে হুমকিতে ফেলতে পারেন না।
  • সত্যিকারের শক্তি হলো দৃঢ় নীতি, ন্যায়পরায়ণতা এবং জনগণের বিশ্বাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।

সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া

গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শহর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাজারসবত্রেতেই মানুষ খালেদা জিয়ার পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছিল। শিশুরা স্কুলে পড়াশোনা শেষে বলছিল,
আমাদের দেশের নেত্রী দেখিয়েছেন, দেশের স্বার্থ  ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে বড়।

নারীরা বলছিলেন,
নারী হতে হলে শুধু ক্ষমতা নয়, নৈতিকতা, দৃঢ়তা এবং দায়িত্ববোধও থাকতে হবে।

পুরুষদেরও এতে প্রেরণা মিলছিলএকজন নেতা কেবল নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নয়, দেশের জনগণকে স্বচ্ছ নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুযোগ দেওয়ার জন্য নিজের পদত্যাগ করতে পারেন।

ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ

১৯৯৬ সালের এই পদত্যাগ কেবল রাজনৈতিক একটি ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক

  • এটি দেখায় যে দেশের স্বার্থ গণতন্ত্রের জন্য ক্ষমতা ত্যাগ করা যায়।
  • এটি নতুন প্রজন্মের নেতাদের জন্য নৈতিক রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত
  • এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেখায়, যে দেশ তার নেতা প্রতিষ্ঠানকে সম্মান দেয়, সেখানে গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী হয়।

পদত্যাগের পর নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের ভোটাধিকার ব্যবহার করল। নতুন সরকার গঠন, নতুন নীতি প্রণয়নসবই স্বচ্ছ জনগণের আস্থা রক্ষায়। খালেদা জিয়ার এই পদক্ষেপ শুধু দেশের জন্য নয়, দেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করল।

বেগম খালেদা জিয়ার পদত্যাগের ঘটনা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব রাজনীতির জন্যও একটি উদাহরণ। এটি দেখায়, একজন নেতা কখনো নিজের স্বার্থকে দেশের গণতন্ত্রের চেয়ে এগিয়ে রাখবে না। তার সাহস, ন্যায়পরায়ণতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

গণতান্ত্রিক দৃষ্টান্তের এই অধ্যায় দেশের মানুষকে বিশ্বাস দিচ্ছেসত্যিকারের নেতৃত্ব হল আপসহীন, নৈতিক, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ এবং দেশের স্বার্থের প্রতি অটল।

চলবে…………