ঢাকা, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৮:০০ AM

প্রথম পরিচয়-৪

মান্নান মারুফ
16-01-2026 12:38:32 PM
প্রথম পরিচয়-৪

পর্ব ৪: চোখে চোখে কথা

সিডনির সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ক্যাফের ভেতরে ছড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত শান্তি। ল্যাপটপের পর্দায় ভেসে উঠেছে ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তার ছবি। কুদ্দুছ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে—চোখে ঘাম আর অশ্রুর মিশ্রণ, স্বপ্ন ও বাস্তবতার এক প্রবল সংঘর্ষ।

“দেখছ?” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল, “এটাই আমার শহর। বর্ষার দিনগুলো, ধুলোমাখা রাস্তাগুলো, ভ্যাপসা গন্ধ—সবই আমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”

অ্যামেলিয়া তার দিকে তাকাল। চোখে বিস্ময় আর গভীর কৌতূহল।
“এত সুন্দরভাবে তুমি সবকিছু অনুভব করাতে পারছ কীভাবে?”

কুদ্দুছ হালকা হাসল।
“শুধু বর্ণনা করলেই হয় না। অনুভব করতে হয়। চোখে চোখ রাখলে মানুষ তা বুঝতে পারে।”

অ্যামেলিয়ার চোখে ঝলক জ্বলে উঠল—এক অদ্ভুত আগ্রহ।
“তাহলে আমাকে দেখাও?”

কুদ্দুছ হাসতে হাসতে বলল,
“দেখাতে চাই, তবে শুধু চোখে চোখে। শব্দের দরকার নেই।”

এক মুহূর্তের জন্য তারা নীরবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। কফির গরম বাষ্প, ক্যাফের মৃদু আলো, আর দূরের রাস্তার ক্ষীণ শব্দ—সব মিলেমিশে তাদের মধ্যে তৈরি করল এক অদৃশ্য বন্ধন।

“তুমি জানো,” হঠাৎ অ্যামেলিয়া বলল, “আমি সব সময় এমন কিছু খুঁজেছি—যা সত্যি, যা অনুভব করা যায়। তুমি আমাকে দেখালেই মনে হয়, সত্যিই এমন কিছু আছে।”

কুদ্দুছ ধীরে চোখ মেলে বলল,
“এটাই আসল জীবন। সহজ বা কঠিন—তা নয়; অনুভূতি যা দেয়, সেটাই বড়।”

অ্যামেলিয়া হেসে বলল,
“তুমি জানো, তোমার চোখে কী আছে? এক অদ্ভুত শক্তি। যেন সবাইকে নিজের গল্প বলতে বাধ্য করো।”

“হয়তো,” কুদ্দুছ শান্ত স্বরে বলল, “কারণ আমিও চাই কেউ আমার গল্প শুনুক। জানতে চাই—আমার মতো করে কেউ সহজ সুখের গল্প খোঁজে কি না।”

হাতের গরম কফির কাপ ধরে তারা পাশাপাশি বসে রইল। অদ্ভুতভাবে, এই ছোট্ট আড্ডাই তাদের কাছে হয়ে উঠল এক বিশাল পৃথিবী।

“কুদ্দুছ,” অ্যামেলিয়া ধীরে বলল, “আমি কি কখনো তোমার সঙ্গে থাকতে পারব? এই শহরের বাইরের পৃথিবীটা বুঝতে পারব?”

কুদ্দুছের চোখে এক চাপা শ্বাসরোধী অনুভূতি।
“আমি চাই। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় আমাদের সঙ্গেই থাকবে—ভিসা, পড়াশোনা, পরিবার—সবকিছু।”

অ্যামেলিয়া মৃদু হাসল।
“যদি সত্যিকারের ভালোবাসা থাকে, আমরা সব বাধা পেরোতে পারব। চোখে চোখ রাখলেই তা বোঝা যায়।”

ক্যাফের বাইরে দিয়ে গাড়ির হালকা শব্দ ভেসে এলো। ঢাকার গল্প আর সিডনির বাস্তবতা তাদের কল্পনায় মিশে তৈরি করল এক নতুন পৃথিবী।

“তুমি জানো,” কুদ্দুছ বলল, “আমি ভাবছি—আমাদের গল্প শুধু আজকের নয়। হয়তো একদিন আমাদের স্বপ্ন বাস্তব হবে।”

অ্যামেলিয়ার চোখ জ্বলে উঠল।
“আমি চাই সেটাই হোক। পৃথিবী যত বাধাই দিক, আমরা একসাথেই থাকব।”

হঠাৎ অ্যামেলিয়ার ফোন বেজে উঠল। বাবা। কণ্ঠে চাপা রাগ, কঠোরতা।
“অ্যামেলিয়া, তুমি কী ভাবছ? তুমি আমাদের নিয়ম ভেঙেছ। এই সম্পর্ক কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না।”

অ্যামেলিয়া গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ফোন কেটে দিল। চোখে তখন এক অদ্ভুত শান্ত দৃঢ়তা।

“কুদ্দুছ,” সে বলল, “যদি পৃথিবী আমাদের জন্য জায়গা না দেয়, আমরা নিজেরাই আমাদের জায়গা তৈরি করব।”

কুদ্দুছ তার হাত ধরে বলল,
“আমি দেখাব কীভাবে। আমরা একে অপরকে হারাব না।”

সেই রাতে তারা কফির টেবিলের পাশে বসে গভীরভাবে চোখে চোখ রাখল। কোনো শব্দ নয়—শুধু অনুভূতি। কুদ্দুছ মনে করল, এই এক মুহূর্তের চোখের মিলনেই জীবনের সব ঝুঁকি, সব অন্ধকার হালকা হয়ে যাচ্ছে।

“তুমি জানো, আমি কেমন অনুভব করছি?” অ্যামেলিয়া ফিসফিস করে বলল।

“না। বলো।”

“আমি ভয় পাচ্ছি। কিন্তু ভয় থাকলেও আমরা একসাথে থাকব—একে অপরকে সমর্থন করব।”

কুদ্দুছ হাসল।
“হ্যাঁ। সেই সমর্থনই আমাদের পৃথিবী গড়ে তুলবে—আজকের অন্ধকার পেরিয়ে আগামী দিনের আলো।”

এক মুহূর্ত নীরবতা। কফির উষ্ণতা, বাতাসের মৃদু শব্দ আর হৃদয়ের স্পন্দন—সব মিলেমিশে তৈরি করল এক নতুন বাস্তবতা।

“শোনো,” কুদ্দুছ ধীরে বলল, “তুমি যদি সত্যিই আমার পাশে থাকো, আমি যেকোনো ঝুঁকি নেব। পৃথিবী যত বাধাই দিক না কেন।”

অ্যামেলিয়ার চোখে রোমাঞ্চের দীপ্তি।
“আমি জানি। আমি এখানেই আছি। এবং থাকব।”

সেদিন তাদের সম্পর্ক আর শুধু পরিচয় বা বন্ধুত্বে সীমাবদ্ধ রইল না। তা হয়ে উঠল এক গভীর সংযোগ—চোখে চোখের ভাষা, হৃদয়ে হৃদয়ের প্রতিশ্রুতি।

শহরের শব্দ, কফির উষ্ণতা আর চোখে চোখের নীরব কথোপকথন—সব মিলেমিশে তৈরি করল তাদের নিজস্ব পৃথিবী, যেখানে ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় সত্য।