ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৪:২৬:২৬ PM

দীর্ঘ দিন মর্গেই পড়ে ছিল এক মেজরের মরদেহ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
09-08-2026 03:38:04 PM
দীর্ঘ দিন মর্গেই পড়ে ছিল এক মেজরের মরদেহ

প্রায় আড়াই বছর ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পড়ে ছিল অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জাহিদুল ইসলামের মরদেহ—এমনই দাবি তার পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় পরও মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এমনকি পরবর্তীতে পরিবার তার মরদেহের সন্ধানও পায়নি। মেজর জাহিদুল ইসলাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন দক্ষ, মেধাবী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০০০ সালে ৪৩তম বিএমএ লং কোর্সের মাধ্যমে তিনি সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি কঙ্গোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া পাকিস্তানে মিড-ক্যারিয়ার কোর্স এবং কানাডায় উচ্চতর প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেন।

২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রূপনগরে নিজের ভাড়া বাসার নিচে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মেজর জাহিদ। তৎকালীন পুলিশের ভাষ্য ছিল, তিনি অস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করেছিলেন এবং আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালায়। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে আসে।

তবে পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, মেজর জাহিদের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে আসে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত একটি অভিযোগে দাবি করা হয়, তাকে হত্যার পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল এবং তিনি ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৯ সালে মেজর জাহিদের পিলখানায় পোস্টিং হলেও তিনি সেখানে যোগ দেননি। সে সময় সেখানে কর্মরত ছিলেন তার বন্ধু ক্যাপ্টেন শহীদ মাজহারুল হায়দার। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের সময় মাজহারুল ফোনে জাহিদকে জানিয়েছিলেন যে, একের পর এক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হচ্ছে। এই ফোনালাপ এবং পরবর্তী সময়ে জাহিদের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন দাবি রয়েছে।

পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর মেজর জাহিদ বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার ছিলেন এবং তার কাছে থাকা কিছু সংবেদনশীল তথ্য তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। একপর্যায়ে ২০১৫ সালে তাকে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়।

এরপর ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঘটে তার মৃত্যু। পরিবারের দাবি, তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং পরে বাসার নিচে নিয়ে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার শরীরে ২৯টি গুলির আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি তার চোখ উপড়ে ফেলারও অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, তৎকালীন পুলিশের এজাহারে বলা হয়, মেজর জাহিদ ছুরি ও পিস্তল নিয়ে পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালায়। তবে পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, ফরেনসিক তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ওই সরকারি বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং পুরো ঘটনাটি সাজানো ছিল।

মেজর জাহিদের মৃত্যুর পর তার পরিবারের ওপরও নেমে আসে ভয়াবহ দুর্ভোগ। অভিযোগ রয়েছে, হত্যার রাতেই তার স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা এবং দুই শিশুসন্তানকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যায়। পরিবারের দাবি, স্ত্রী ও ছোট মেয়েকে দীর্ঘ সময় কথিত ‘আয়নাঘরে’ আটক রাখা হয়।

২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার আজিমপুরে তিন শিশুকে উদ্ধারের নামে যে অভিযান চালানো হয়, সেখানেও মেজর জাহিদের পাঁচ বছর বয়সী বড় মেয়ে জুনাইরা বিনতে জাহিদকে আটকের অভিযোগ ওঠে। পরে একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর তার স্ত্রী ও ছোট মেয়েকে নিয়ে আরেকটি কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এরপর জেবুন্নাহার শিলার বিরুদ্ধে একাধিক জঙ্গি মামলা দেওয়া হয়।

দীর্ঘ প্রায় চার বছর কারাভোগের পর তার জামিন হলেও পরে তা বাতিল করে আবারও তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তিনি পুনরায় জামিন পান। তবে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বোঝা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

এদিকে, একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোক সহ্য করতে না পেরে মেজর জাহিদের বাবা-মা দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এক বছরের মধ্যেই মারা যান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

একজন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ, তার মরদেহের হদিস না পাওয়া, স্ত্রী-সন্তানদের দীর্ঘদিন আটক রাখা এবং পরিবারের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা—সব মিলিয়ে মেজর জাহিদুল ইসলামের ঘটনাটি এখনো বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়।

সত্যিকার অর্থে কী ঘটেছিল ২০১৬ সালের সেই রাতে? কেন একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে এভাবে হত্যা করা হলো? তার মরদেহ কেন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি? পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র ছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তই পারে দীর্ঘদিনের রহস্যের জট খুলতে।

একটি পরিবারের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা এই নিপীড়নের অভিযোগেরও প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত। কারণ, কোনো রাষ্ট্রেই সত্য উদঘাটনের পথ বন্ধ করে দিয়ে একটি পরিবারকে বছরের পর বছর মামলা, কারাবাস, নিখোঁজ স্বজন ও সামাজিক অপমানের ভার বহন করতে বাধ্য করা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।