ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৯:৩৪:৩৬ PM

বিএনপি ক্ষোভ ও হতাশাসহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
22-09-2026 07:26:37 PM
বিএনপি ক্ষোভ ও হতাশাসহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা এবং মাঠপর্যায়ে এক ধরনের অস্বস্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসা দলটির পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা আজও যথাযথ মূল্যায়ন বা সুযোগ না পাওয়ায় সংগঠনের ভেতরে ক্ষোভ ও হতাশা দানা বাঁধছে। একইসঙ্গে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলা বিভিন্ন জাতীয় সংকট এবং সরকারের নানা নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে এক বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

১. জাতীয় সংকট ও জনরোষের মুখে রাজনৈতিক বাস্তবতা
বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ দৃশ্যমান:

অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ঘাটতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ভেঙে দিয়েছে।

স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: ডেঙ্গু ও হামের মতো রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিন বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য জনমনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।

সরকারের ওপর ক্ষোভ ও রাজনৈতিক হিসাব: উপরোক্ত বহুমুখী সংকটের কারণে জনরোষ তৈরি হলেও, বিরোধী দল হিসেবে বিএনপিকেও অনেক ক্ষেত্রে জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। প্রতিপক্ষ বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণায় বিএনপিকে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চলছে।

স্থানীয় নেতৃত্বের স্থবিরতা: সারাদেশে দলীয় কার্যক্রমে ভাটা পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয় নেতাদের অসহযোগিতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিষ্ক্রিয়তা এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ—মন্ত্রীদের সাথে সাক্ষাৎ না পাওয়া ও তাঁদের অবহেলা করার প্রবণতাকে দায়ী করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের এই বিরূপ মনোভাব যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের ভরাডুবির আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই সংকট উত্তরণে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

২. ঢাকা মহানগর ও জাতীয় নেতৃত্বে দায়িত্ব বিভাজন ও মূল্যায়ন

দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে এবং বর্তমান সাংগঠনিক বাস্তবতা বিবেচনা করে ঢাকার শীর্ষ ও পরিচিত নেতাদের যথাযথ এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন এবং মূল্যায়নের মাধ্যমে মাঠের রাজনীতি চাঙ্গা করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে যারা অতীতে দলের দুর্দিনে ও সুখের সময়ে পরীক্ষিত ভূমিকা রেখেছেন কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পদ বা সুযোগ পাননি, তাদের আরও জোরালো দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রধান জাতীয় নেতাদের এলাকাভিত্তিক ও কৌশলগত দায়িত্ব:

রুহুল কবির রিজভী (ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব): দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর ও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ের পাশাপাশি সারাদেশে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে তাঁকে সার্বিক নীতিনির্ধারণী ও মাঠপর্যায়ের তদারকির মূল দায়িত্বে রাখা প্রয়োজন।

মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: ঢাকার রাজনীতিতে এই দুই প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। মির্জা আব্বাসকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকার মূল সমন্বয়ক এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে ঢাকা জেলার আশেপাশের এবং ঢাকা উত্তর প্রান্তের দলীয় কার্যক্রম গতিশীল করার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও নজরুল ইসলাম খান: অর্থনৈতিক ও শ্রমজীবী বিষয়ক নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি তাঁদের ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে কাজে লাগাতে হবে।

ড. আবদুল মঈন খান ও সালাহউদ্দিন আহমেদ: বুদ্ধিবৃত্তিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে দলের নেতাকর্মীদের আইনি ও সাংগঠনিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্বে তাঁদের রাখা যেতে পারে।

ঢাকার মাঠপর্যায়ের পরীক্ষিত ও পরিচিত নেতৃত্ব:

আমানউল্লাহ আমান: ঢাকার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা এবং ২০২৬ সালে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া এই নেতাকে ঢাকা বিভাগের সার্বিক রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রধান দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

হাবিব-উন-নবী খান সোহেল: যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকার রাজনীতির পরিচিত মুখ। তাঁকে ঢাকা মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ড ও থানায় তরুণ ও যুবসমাজকে সংগঠিত করার দায়িত্ব দিতে হবে।

আমিনুল হক, রফিকুল আলম মজনু ও তানভীর আহমেদ রবিন,ইশরাক হোসেন: ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের মূল সাংগঠনিক কাঠামোগুলোকে চাঙ্গা করতে এই চার তরুণ ও লড়াকু নেতাকে মাঠপর্যায়ের সরাসরি দায়িত্ব অর্পণ করা আবশ্যক। অতীতে তাদের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা মূল্যায়ন করে তাদের নেতৃত্বে ওয়ার্ড কমিটিগুলো পুনর্গঠন করতে হবে।

৩. তৃণমূলের অবমূল্যায়ন ও সংকট সমাধানের পথ

দলের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে মনে করে আসছে যে, যারা দুঃসময়ে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেই পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা অনেক সময় যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:

ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন: সাইফুল আলম নীরব,  মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন, এস এম জাহাঙ্গীর, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, এ বি এম এ রাজ্জাক, আক্তার হোসেন, আতাউর রহমান, গাজী রেজাউনুল হোসেন রিয়াজ, তুহিরুল ইসলাম তুহিন, এম কফিল উদ্দিন, আফাজ উদ্দিন, হাজী মো. ইউসুফ, শাহ আলম, মাহাবুবুল আলম মন্টু ও মোস্তফা জামানসহ ঢাকার বিভিন্ন স্তরের ত্যাগী নেতাদের প্রত্যক্ষ সাংগঠনিক দায়িত্ব ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে।

সমন্বিত উদ্যোগ: একইভাবে রফিকুল আলম মজনু ও তানভীর আহমেদ রবিনদের সাথে সমন্বয় করে হারুনুর রশিদ হারুন, আ.ন.ম. সাইফুল ইসলাম, লিটন মাহমুদ, আব্দুস সাত্তার, মোশররফ হোসেন খোকন, সাইদুর রহমান মিন্টু, মকবুল হোসেন সরদার, ফারুকুল ইসলাম, আরিফা সুলতানা রুমা এবং আনোয়ার পারভেজ বাদলদের মতো নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের ওয়ার্ড থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা উচিত।

জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি: শুধুমাত্র ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং ডেঙ্গু প্রতিরোধ সচেতনতা বৃদ্ধি, সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণের দ্বারে দ্বারে যেতে হবে।

বর্তমান রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে বিএনপিকে টিকে থাকতে হলে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। বিভেদ ভুলে, পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করে এবং সুনির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে দলকে নতুন আঙ্গিকে সাজাতে হবে। জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলোর সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে একটি গণমুখী রাজনৈতিক ধারা তৈরি করতে পারলেই কেবল সরকারের নানামুখী ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে বিএনপি তার হারানো গৌরব ও জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে সক্ষম হবে।