প্রথম পর্ব
বিকেলের শেষ আলো তখনও শহরের পুরোনো প্রেসক্লাবের গলিটার ওপর ঝুলে ছিল। ধুলো-মাখা দেয়ালে এসে সেই আলো থমকে দাঁড়িয়েছিল—হলুদ আর কমলার মাঝামাঝি এক ক্লান্ত রঙে। রাস্তার কোণের চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসছিল ফুটন্ত পাতিলের টুংটাং শব্দ, সঙ্গে পুরোনো রেডিওতে কারও ভাঙা গলার গান—
“এই পথ যদি না শেষ হয়…”
গানটা যেন শহরের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল।
রাস্তার পাশের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানটায় আজও ভিড় জমেছে। ভাঙা বেঞ্চ, ধোঁয়া ওঠা কেতলি, পুরোনো খবরের কাগজ আর অন্তহীন রাজনৈতিক তর্ক—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন শহরের ক্ষুদ্র সংসদ। এখানে সরকার বদলায় দিনে তিনবার, আদর্শ বদলায় প্রতি ঘণ্টায়, আর মানুষের চরিত্র বদলায় মিনিটে মিনিটে।
দোকানের এক কোণে বসে ছিল রাশেদ। তার সামনে রাখা চায়ের কাপ অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে, তবু সে কাপটা হাতে ধরে রেখেছে—যেন উষ্ণতার শেষ স্মৃতিটুকু আঁকড়ে আছে। চোখ রাস্তার দিকে, অথচ মন অন্য কোথাও। মাঝে মাঝে ভিড়ের শব্দ থেমে গিয়ে শুধু রেডিওর কর্কশ সুরটাই কানে এসে বাজছিল।
ঠিক তখনই গলির মাথায় একটা রিকশা এসে থামল।
নেমে এল এক মেয়ে।
সাদা-কালো ছাপার শাড়ি, কাঁধে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ। সন্ধ্যার আধো আলোয় মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না, কিন্তু রাশেদের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। কিছু কিছু মুখ সময় মুছে দিতে পারে না; বরং দূরত্ব তাদের আরও গভীর করে তোলে।
মেয়েটি একবার চারপাশে তাকাল, তারপর ধীরে ধীরে চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে এলো। দোকানের রাজনৈতিক তর্ক যেন আচমকা থেমে গেল। কেতলির ধোঁয়া, মানুষের গলা, রেডিওর গান—সব কিছুর মাঝখানে শুধু তার পায়ের শব্দটাই আলাদা করে শোনা যাচ্ছিল।
রাশেদ বুঝল, কিছু মানুষ কখনো ফিরে আসে না—তবু তাদের জন্য অপেক্ষা কোনোদিন শেষ হয় না।
চায়ের দোকানের মালিক রহিম মিয়া গ্লাসে চা ঢালতে ঢালতে বলল,
—শুনছেন? কুদ্দুস আবার প্রেসক্লাবে সদস্যপদ নিয়ে আগুন লাগাইছে।
একজন আগ্রহ নিয়ে সামনে ঝুঁকল।
—আবার কী কইছে?
রহিম মিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—কইছে, এখন সদস্যপদ নাকি তিন ভাগে ভাগ হয়। এক ভাগ সাংবাদিক, এক ভাগ দলীয় লোক, আর বাকি ভাগ টাকার বিনিময়ে কেনা মানুষ।
দোকানে চাপা হাসি উঠল। কেউ বিড়িতে আগুন ধরাল, কেউ চায়ের কাপ নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রহিম মিয়া আবার বলল,
—আরও কইছে, বড় এক নেতার নাম ভাঙাইয়া সদস্য বানানোর ব্যবসা চলে। তালিকা নাকি আগে নেতার কাছে যায়, তারপর অনুমোদন আইলে সদস্যপদ হয়। ক্লাবের এই চাদাঁবাজ নেতা রাজনৈতিক নেতার পরিচয় দিয়ে ভয় দেখাইয়া কত টাকা কামাইছে, সেই হিসাব কেউ জানে না। ক্লাবের বারান্দা থেইকা শুরু কইরা এখন পুরো রাজধানীতে এই আলোচনা।
একজন বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ঠোঁট বাঁকাল।
—ওরে তো আপনি চিনেন না নাকি? কুদ্দুস একটা বেয়াদব।
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে সায় দিল।
—একদম বেয়াদব। কারও মান-সম্মান বোঝে না। মুখে যা আসে তাই বলে।
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। কথাগুলোও ঠিক সেই ধোঁয়ার মতো বাতাসে ভেসে যাচ্ছিল। অথচ আশ্চর্যের বিষয়—যারা “বেয়াদব” শব্দটা বলছিল, তাদের কেউই শব্দটার প্রকৃত অর্থ জানত না। তারা শুধু জানত, যে মানুষ মাথা নোয়ায় না, তাকে একটা নাম দিতে হয়। সমাজের অভিধানে সেই নাম—“বেয়াদব”।
ঠিক তখনই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল কুদ্দুস।
পরনে ধূসর রঙের সস্তা শার্ট, হাতে পুরোনো ব্যাগ। সাদা পাঞ্জাবি নয়, দামি স্যুটও নয়। মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে ছিল অদ্ভুত এক স্থিরতা—যেন বহু অপমান, বহু বিশ্বাসঘাতকতা পেরিয়েও ভেতরের আগুন এখনো নিভে যায়নি।
রহিম মিয়া তাকে দেখে ডাক দিল,
—কুদ্দুস ভাই, এক কাপ চা খাইয়া যান।
কুদ্দুস থামল। মৃদু হাসল।
—চা খাব, তবে বাকিতে না। আগের টাকাটাও আজ শোধ করব।
দোকানে বসা কয়েকজন মুচকি হাসল। সেই হাসিতে বিদ্রূপের গন্ধ ছিল। কারণ এই শহরে মাসের পর মাস বাকিতে চা খেয়ে টাকা না দেওয়া লোকদের সম্মান আছে, কিন্তু সময়মতো পাওনা শোধ করা মানুষকে বোকা ভাবা হয়।
কুদ্দুস বেঞ্চে বসতেই পাশের একজন কটাক্ষ ছুড়ে দিল,
—কী খবর কুদ্দুস ভাই? আবার কাকে সত্য কথা শুনাইলেন?
কুদ্দুস চায়ের কাপ হাতে নিল। শান্ত গলায় বলল,
—যারে বলা দরকার, তারেই বলছি।
লোকটা হেসে উঠল।
—এই জন্যই তো আপনারে মানুষ বেয়াদব কয়।
কুদ্দুসও হাসল। তবে সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে করুণা বেশি ছিল।
—মানুষ এখন সত্য কথা শুনতে ভুলে গেছে ভাই। তাই সত্য বললেই বেয়াদব লাগে।
দোকানটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
এই শহরে সবাই কথা বলে, কিন্তু সত্য খুব কম মানুষই বলে। কারণ সত্য বললে সম্পর্ক নষ্ট হয়, সুযোগ কমে যায়, দাওয়াত বন্ধ হয়ে যায়। সত্য মানুষের মুখোশ খুলে দেয়। আর মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় নিজের মুখ দেখতে।
কুদ্দুস সেই ভয়টা কোনোদিন শেখেনি।
ছোটবেলা থেকেই তার একটা বদঅভ্যাস ছিল—যেটা ভুল, সেটা ভুল বলত। স্কুলে হেডমাস্টার টাকার বিনিময়ে ভর্তি নিচ্ছেন—সে প্রতিবাদ করেছে। কলেজে ছাত্রনেতা চাঁদাবাজি করেছে—সে সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছে। সাংবাদিকতায় এসে দেখেছে, খবরের চেয়ে বিজ্ঞাপনের দাম বেশি; তবু সে কলম থামায়নি।
ফলে শত্রুও বেড়েছে।
এই শহরে শত্রু বানাতে অস্ত্র লাগে না—সততা থাকলেই যথেষ্ট।
চায়ের দোকানের এক কোণে বসা মোটা ভদ্রলোক এবার গলা খাঁকারি দিলেন। তিনি প্রেসক্লাবের প্রভাবশালী সদস্য।
—কুদ্দুস সাহেব, সব জায়গায় এত কঠিন কথা বললে চলে? সমাজে থাকতে হলে একটু কৌশল লাগে।
কুদ্দুস তাকাল।
—কৌশল মানে?
—এই ধরেন… বড় মানুষদের মানিয়ে চলা, সবাইরে একটু সম্মান দেওয়া…
কুদ্দুস মৃদু হেসে বলল,
—সম্মান আর তেল মারা এক জিনিস না, সাহেব।
লোকটার মুখ শক্ত হয়ে গেল। কেউ কেউ অস্বস্তিতে কাশি দিল।
কারণ সত্য কথার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এটা শোনার পর মানুষ নিজের ভেতরের আয়নাটা দেখতে পায়।
কুদ্দুস কখনো কাউকে অকারণে অপমান করেনি। কিন্তু অন্যায়ের সামনে চুপও থাকেনি। ক্লাবের টাকার হিসাবের গরমিল নিয়ে সে প্রশ্ন তুলেছে। নির্বাচন নিয়ে কারচুপি হলে প্রতিবাদ করেছে। অসাংবাদিকদের সদস্যপদ দেওয়া নিয়ে সভার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলেছে—
“যোগ্যতা যদি রক্তের সঙ্গে জন্মাত, তাহলে গরুর ছেলেও কসাই হতো।”
এই কথাটাই পরে শহরের অর্ধেক মানুষ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছে। কেউ হেসেছে, কেউ ক্ষেপেছে। কিন্তু সবাই একমত হয়েছে—কুদ্দুস বেয়াদব।
আসলে কুদ্দুসের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, সে মানুষকে ভয় পেত না।
এই সমাজে যে মানুষ ভয় পায় না, তাকে বিপজ্জনক মনে করা হয়। কারণ ভীত মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ; সাহসী মানুষকে নয়।
সন্ধ্যার আজান ভেসে এলো দূরের মসজিদ থেকে। দোকানের আলাপ কিছুটা স্তিমিত হলো। কুদ্দুস চায়ের শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
রহিম মিয়া টাকা নিতে চাইছিল না।
—থাক কুদ্দুস ভাই, আপনার কাছ থেকে টাকা লাগব না।
কুদ্দুস জোর করে টাকা রেখে দিল।
—না ভাই, হক মাইরা খাওয়ার অভ্যাস আমার নাই।
কথাটা বলে সে হাঁটতে শুরু করল।
পেছন থেকে আবার সেই পরিচিত শব্দটা ভেসে এলো—
—লোকটা আসলেই বেয়াদব!
কুদ্দুস এবার থামল না। শুধু হাঁটতে হাঁটতে আকাশের দিকে তাকাল।
শহরের বাতিগুলো একে একে জ্বলছে। এই আলোয় মানুষ নিজেদের মুখ উজ্জ্বল করে, কিন্তু ভেতরের অন্ধকার ঢেকে রাখে।
হাঁটতে হাঁটতে কুদ্দুসের মনে পড়ল কয়েকদিন আগের ক্লাব মিটিংয়ের কথা।
সভাপতি বলেছিলেন,
—আমাদের সংগঠনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে।
কুদ্দুস তখন শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল,
—ঐতিহ্য মানে কি শুধু চেয়ার বাঁচানো?
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কারণ সোজা প্রশ্ন মানুষকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলে।
তারপর থেকেই অনেকের চোখে কুদ্দুস “সমস্যা”।
অথচ মানুষটা নিজের জন্য কিছুই চায় না। এমপি হতে চায় না, চেয়ারম্যান হতে চায় না। বড় গাড়ি নেই, বাড়ি নেই, ব্যাংক ব্যালেন্স নেই। শুধু একটা জিনিস আছে—বিবেক।
আর এই সমাজে বিবেক নিয়ে চলা মানুষ সবচেয়ে অসহায়।
রাস্তার মোড়ে এসে কুদ্দুস থামল। দূরে কয়েকজন তরুণ সাংবাদিক দাঁড়িয়ে তাকে সালাম দিল।
—কুদ্দুস ভাই, কালকে হাসপাতালে যে ছেলেটার জন্য টাকা তুলছিলেন, এখন ভালো আছে।
কুদ্দুসের মুখে নরম আলো ফুটল।
—আলহামদুলিল্লাহ।
একজন তরুণ দ্বিধাভরে জিজ্ঞেস করল,
—ভাই, মানুষ আপনাকে এত খারাপ বলে কেন?
কুদ্দুস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
—মানুষ দুইটা কথা সহ্য করতে পারে না। একটা সত্য কথা, আরেকটা নিজের ভুলের কথা। আমি দুর্ভাগ্যবশত দুইটাই বলি।
ছেলেগুলো নীরব হয়ে গেল।
রাত নেমে আসছিল ধীরে ধীরে। শহরটা বাইরে থেকে খুব ভদ্র—সবাই হাসে, সালাম দেয়, কুশল জিজ্ঞেস করে। কিন্তু এই হাসির নিচে কত হিংসা, কত ভয়, কত মুখোশ—সেটা কেউ দেখে না।
কুদ্দুস দেখত।
এই দেখাটাই ছিল তার অপরাধ।
আর তাই শহর তাকে একটা নাম দিয়েছে—
“বেয়াদব।”
কিন্তু ইতিহাসের অদ্ভুত নিয়ম হলো, সময়ের কাছে শেষ পর্যন্ত ভদ্রতার মুখোশ নয়, সত্যবাদী মানুষের কণ্ঠই টিকে থাকে।
সেদিন রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছিল খুব নিঃশব্দে।
কুদ্দুস হাঁটছিল একা।
তবু তার একাকীত্বের ভেতরেও এক ধরনের শান্তি ছিল। কারণ সে জানত—
এই শহরে সত্য বলা সত্যিই সবচেয়ে বড় অসভ্যতা।
চলবে…