(শেষ অধ্যায়: বিদায়, স্মৃতি এবং ইতিহাসের স্থান)
দিনটি ছিল শীতল, কিন্তু আবহ মানসিকভাবে তীব্র। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অধ্যায় চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। বেগম খালেদা জিয়া, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, চিরবিদায় নিলেন। তার মৃত্যু শুধু একজন নেত্রীকে হারানো নয়; এটি ছিল পুরো জাতির জন্য এক গভীর শোকের মুহূর্ত।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও শেষ প্রণতি
তার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের প্রস্তুতি ছিল নিখুঁত ও শোকাবহ। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে জানাজায় লাখো মানুষ উপস্থিত হন। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরের রাস্তাগুলো পর্যন্ত মানুষের ঢল নেমেছিল—একটি নেত্রীর প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক।
মানুষের চোখে চোখের জল, হাতে ফুল, আর কণ্ঠে শোকের শব্দ—এমন দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। কেউ কেউ কাঁদছিলেন নীরবে, কেউবা ব্যথা ও শ্রদ্ধা মিশ্রিত উচ্চারণে বলছিলেন,
“আমাদের নেত্রী চলে গেলেন, কিন্তু তার আদর্শ এবং সংগ্রাম চিরকাল আমাদের সঙ্গে থাকবে।”
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংসদের সদস্যরা—সবাই উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক নেতৃত্বও তাদের শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন এবং জানাজা শুধু রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ছিল না; এটি দেশের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শোকস্তব্ধ বাংলাদেশ
দেশের প্রতিটি কোণ শোকের ছায়ায় আচ্ছন্ন। খবরের কাগজ, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবাই এক কণ্ঠে বলছিল, “এক যুগের অবসান।” স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি অফিস—সবখানে মানুষ তার অবদান স্মরণ করছিল।
শহরের রাস্তায় প্রতিটি মানুষ শোকের সাথে তার জীবনের দৃষ্টান্তে প্রশান্তি খুঁজছিল। এক তরুণ লিখেছিল,
“আমরা হারিয়েছি একজন নেত্রী, কিন্তু তার দৃঢ় মনোবল, নৈতিকতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা আমাদের পথ দেখাবে।”
জীবন ও সংগ্রামের প্রতিফলন
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ছিল সংগ্রামের প্রতীক। পারিবারিক জীবন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, কারাবাস, অসুস্থতা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান—সব মিলিয়ে তিনি একটি অপরাজেয় ইতিহাসের অংশ।
জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারী নেতৃত্ব কিভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষের আশা, দলের শক্তি এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অটল রাখতে পারে। তার সংগ্রাম, ত্যাগ এবং আপোষহীন মনোভাবই তাকে “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবে পরিচিত করেছে।
রাজনৈতিক জীবন ও অর্জন
খালেদা জিয়ার রাজনীতির কীর্তি একাধিক নির্বাচনী বিজয়, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনীতি ও নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে অবদান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা—সবই অন্তর্ভুক্ত।
তার জীবন শুধু ক্ষমতা ও পদ নয়; এটি ছিল দায়িত্ব, নৈতিকতা এবং দেশের প্রতি সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতার এক অসাধারণ উদাহরণ। দেশবাসী মনে রাখবে, কঠিন সময়েও ধৈর্যশীল, ন্যায়পরায়ণ এবং নেতৃত্বে অটল থাকা যায়।
অসুস্থতা ও শেষ দিনগুলি
অবশেষে দীর্ঘ অসুস্থতা তার জীবনকে প্রভাবিত করে। কারাবাস, রাজনৈতিক চাপ, মানসিক ও শারীরিক সংগ্রাম—সব মিলিয়ে তার জীবনশেষ কয়েক বছর এক ধরনের দীর্ঘ সংগ্রাম ও ধৈর্যের অধ্যায় হয়ে ওঠে।
পরিবার ও ঘনিষ্ঠরা প্রতিদিন তার পাশে থাকলেও, তার দৃঢ় মনোবল, মানসিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সচেতনতা—সবই তাকে শেষ সময় পর্যন্ত শক্ত রাখে।
দেশের প্রতিক্রিয়া
তার মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক দল, সরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সকলেই শোকাহত।
এক সাধারণ নাগরিক বলেছিলেন,
“তিনি চলে গেলেন, কিন্তু তার আদর্শ, দৃঢ়তা এবং দেশের জন্য তার আত্মত্যাগ আমাদের মাঝে চিরকাল বাঁচবে।”
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাকে স্মরণ করে। তারা উল্লেখ করেছে, একজন নারীর নেতৃত্বে দেশের গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা কতটা প্রভাবিত হতে পারে।
ইতিহাসে স্থান
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। তার অর্জন, সংগ্রাম, প্রতিহিংসার মোকাবিলা, অসুস্থতা এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা—সবই এক নেত্রীর ইতিহাসিক প্রতীক।
তিনি দেখিয়েছেন,
- নেতৃত্ব শুধু ক্ষমতার দখল নয়; এটি দায়িত্ব, নৈতিকতা এবং দেশের জন্য আত্মত্যাগের গল্প।
- একজন নেতা কঠিন পরিস্থিতিতেও জনগণের আশা ও আস্থা অটল রাখতে পারে।
- নারীর ক্ষমতা, স্থিতিশীলতা এবং নৈতিক নেতৃত্ব দেশের ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ ফেলতে পারে।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগের সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু তার ত্যাগ, সংগ্রাম এবং আপোষহীন নেতৃত্ব ইতিহাসে অমর হয়ে রয়ে গেছে।
দেশবাসী, দলীয় নেতারা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—সবাই তাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আর এক দিনের মধ্যে নয়, বরং বেগম খালেদা জিয়ার পুরো জীবনই শিক্ষা, উদাহরণ এবং নেতৃত্বের অটলতা প্রদর্শন করেছে।
এই চিরবিদায় শুধু শোক নয়; এটি ভবিষ্যতের নেতাদের জন্য দৃষ্টান্ত, যে দৃঢ় মনোবল, নৈতিকতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলেই একজন নেতা চিরকাল মানুষের মনে বেঁচে থাকতে পারে।
বেগম খালেদা জিয়ার নাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্থায়ী। তার জীবন, সংগ্রাম এবং নেতৃত্ব চিরকালই জাতির জন্য প্রেরণা, শিক্ষা এবং অহংকারের উৎস হিসেবে থাকবে।