ঢাকা, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৫:০১:১২ PM

উপন্যাস : প্রতিবন্ধী

মান্নান মারুফ
04-02-2026 03:41:24 PM
উপন্যাস : প্রতিবন্ধী

পর্ব–১ : মানুষ কি এরা?

এদের কি কেউ মানুষ বলবে? এরা কি আদৌ মানুষ?

এই প্রশ্নগুলো কুদ্দুছের মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করে চেপে ধরেছে কেউ। চোখের সামনে যা দেখছে, তা বোঝানোর মতো কোনো ভাষা সে খুঁজে পাচ্ছে না। ভয়ংকর—না, শুধু ভয়ংকর বললেও কম বলা হয়। এটা অমানবিক, নিষ্ঠুর, নির্মম—তবুও যেন শব্দগুলো ব্যর্থ হয়ে যায়।

ঝিকরগাছার কীর্তিপুর গ্রামটা মানচিত্রে খুব একটা চোখে পড়ে না। ছোট্ট গ্রাম, কাঁচা রাস্তা, বর্ষায় কাদায় ভরে যায়, শীতে ধুলোয়। এই গ্রামের একেবারে শেষ মাথায়, খালের ধারে, টিনে ঢাকা এক জীর্ণ ঘরে জন্ম নিয়েছিল পারভেজ।

জন্মের সময় কেউ খুশি হয়নি।

কারণ, পারভেজ জন্মেছিল বাক্‌প্রতিবন্ধী হয়ে।

সে কথা বলতে পারে না। চিৎকার করতে পারে না। নিজের কষ্ট, ক্ষুধা, ভয়—কিছুই ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। জন্ম থেকেই সে যেন এক নীরব পৃথিবীতে বন্দী।

পারভেজের পরিবারটি এমনিতেই অসহায়। দিন আনে দিন খায়—এই কথাটাও যেন বিলাসিতা তাদের জন্য। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। ঝিয়ের কাজ, বাসন মাজা, ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার—যা পায় তাই। বাবার অস্তিত্ব আছে, আবার নেইও। লোকটা ঘরে থাকে বটে, কিন্তু সংসারের বোঝা সে বহন করতে জানে না। অসুখে পড়ে, কখনো কাজে যায় না, কখনো দিনের পর দিন চুপচাপ বসে থাকে। মানুষটা যেন বেঁচে থেকেও মৃত।

এই ঘরেই বড় হতে থাকে পারভেজ।

ছোটবেলা থেকেই সে আলাদা। অন্য বাচ্চারা যখন কথা শেখে, ডাকাডাকি করে, হাসে—পারভেজ তখন চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। চোখ দুটো বড় বড়, ভেতরে যেন অসংখ্য কথা জমে আছে, কিন্তু বেরোবার পথ নেই।

গ্রামের মানুষ প্রথমে অবাক হয়েছিল। তারপর বিরক্ত। তারপর নিষ্ঠুর।

“বোবা ছেলে।”
“অপয়া।”
“এটা মানুষ না।”

এই কথাগুলো পারভেজ শুনতে পায় না—ভাবত সবাই। কিন্তু কেউ জানে না, শব্দ না শুনলেও অপমান সে বোঝে। চোখের দৃষ্টি, মুখের ভঙ্গি, আঙুল তুলে হাসাহাসি—সবই সে বোঝে।

স্কুলে তাকে কেউ নিতে চায়নি। শিক্ষক বলেছিল,
“ওকে দিয়ে কী হবে? কথা বলতে পারে না, পড়বে কীভাবে?”

মা অনেক কেঁদেছিল। অনেক অনুনয় করেছিল। তবুও হয়নি।

পারভেজ বড় হতে থাকে—নীরবে, একা।

সে কাজ করতে শেখে। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখের ইশারায় বোঝায় সে কী চায়। কখনো খালে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জল দেখে। কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়।

কিন্তু পৃথিবী তার প্রশ্নের উত্তর দেয় না।

বরং পৃথিবী তাকে বারবার আঘাত করে।

গ্রামের ছেলেরা তাকে দিয়ে হাস্যকর কাজ করায়। কেউ ঢিল ছোড়ে, কেউ ঠাট্টা করে, কেউ তাকে তাড়া করে। পারভেজ দৌড়ায়, পড়ে যায়, উঠে আবার দৌড়ায়। সে চিৎকার করতে পারে না—এইটাই তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

একদিন বাজার থেকে ফেরার পথে কিছু লোক তাকে আটকায়। হাসে, ফিসফিস করে। কেউ তার কাঁধে হাত রাখে, কেউ ঠেলে দেয়। পারভেজ ভয়ে কাঁপতে থাকে। চোখে জল জমে ওঠে। সে হাত জোড় করে—মাফ চায়, কথা না বলেও।

কেউ শোনে না।

সেদিন রাতে পারভেজ বাড়ি ফেরে দেরিতে। মায়ের চোখে আতঙ্ক। সে শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে—কী হয়েছে? পারভেজ কিছু বলতে পারে না। শুধু মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।

মা সব বুঝে যায়। আর কিছু বলে না। শুধু ছেলেকে বুকে টেনে নেয়।

এই সমাজে বোবা ছেলের কান্নার শব্দ শোনার কেউ নেই।

কুদ্দুছ এইসব জানত না। সেদিন ঘটনাস্থলে না গেলে জানতও না। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করত না—মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে।

পারভেজ সেদিন মাটিতে পড়ে ছিল। শরীর কাঁপছিল। চোখ দুটো ফাঁকা। চারপাশে লোক—কেউ ভিডিও করছে, কেউ হাসছে, কেউ নির্বিকার।

কুদ্দুছের হাত কেঁপে উঠেছিল।

এই দৃশ্য দেখে তার মনে হয়েছিল—এই সমাজে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বোবা হওয়া নয়, সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো মানুষ না হওয়া।

পারভেজ তখনও কথা বলতে পারছিল না। কিন্তু তার চোখে লেখা ছিল—একটা দীর্ঘ আর্তনাদ। এমন আর্তনাদ, যা শুনতে কান লাগে না—মানুষ লাগে।

কুদ্দুছ জানত, এই গল্প এখানেই শেষ নয়।
এটা শুধু শুরু।

কারণ পারভেজের জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়গুলো তখনও বাকি।

আর প্রশ্নটা তখনও বাতাসে ঝুলে ছিল—

এদের কি কেউ মানুষ বলবে?   

চলবে..........