পর্ব–৪ : নীরব হত্যার আর্তনাদ
নাজু কেঁদেই যাচ্ছিল।
তার কান্না থামানোর কেউ ছিল না। সে কাঁদছিল শব্দ করে, বুক ফেটে বের হওয়া কান্নায়। যেই চোখ দুটো দিয়ে সে সব সময় পারভেজকে সাহস দিত, সেই চোখ দুটো আজ লাল হয়ে ফুলে গেছে। তার সামনে বারবার ভেসে উঠছিল পারভেজের মুখ—নির্বাক হাসি, চোখের ভাষা, নীরব ভরসা।
শুক্রবার বিকেলটা শুরু হয়েছিল অন্য দিনের মতোই। ঝিকরগাছার আঙ্গারপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে লোকজন যাতায়াত করছিল। কলাবাগানটা ছিল নিরিবিলি। হঠাৎ একজন পথচারী লক্ষ্য করল—কলাগাছের ভেতরে কিছু একটা পড়ে আছে। প্রথমে ভেবেছিল কোনো পশু হবে। কিন্তু কাছে যেতেই বুকটা কেঁপে উঠল।
মানুষের দেহ।
নিথর। নড়াচড়া নেই। শরীরটা কাদা আর পাতায় মাখামাখি। লোকজন জড়ো হতে লাগল। কেউ মুখ ঢেকে ফেলল, কেউ দূরে দাঁড়িয়ে রইল। দেহটা যখন পরিষ্কার করে দেখা হলো, তখনই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল খবর—
এটা বাকপ্রতিবন্ধী পারভেজ।
খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল গ্রামে। মানুষ ছুটে এলো। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। যে ছেলেটা প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে শান্তভাবে বাড়ি ফিরত, সে আজ কলাবাগানের ভেতরে নিথর পড়ে থাকবে—এটা মানতে কারও মন সায় দিচ্ছিল না।
পারভেজের শরীরে আঘাতের চিহ্ন। মুখে কোনো কথা নেই—জীবনেও ছিল না, মৃত্যুতেও নেই। যেন তার নীরবতাই তার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল।
প্রশ্ন উঠতে লাগল চারদিকে—
কে করল এটা?
কেন করল?
একজন অন্ধ পিতার বাকহীন সন্তানের সঙ্গে এমন নির্মমতা কেন?
কেউ উত্তর দিতে পারছিল না।
কেউ কেউ চাপা স্বরে বলছিল,
“ও তো কারও ক্ষতি করেনি।”
“ভিক্ষা ছেড়ে কাজ করছিল—এটাই কি দোষ?”
আর কেউ কেউ গলা উঁচু করে বলছিল,
“এরা মানুষ না। এরা অমানুষ।”
একজন বৃদ্ধ বলেছিল,
“অমানুষ না—এরা অমানুষের চেয়েও অধম। জীবজন্তু পর্যন্ত এমন করে না। অন্ধ পিতার বোবা ছেলেকে এভাবে মারতে পারে শুধু মানুষ নামের হিংস্র জানোয়াররা।”
এই কথাগুলো বাতাসে ভাসছিল, কিন্তু কোনো বিচার আসছিল না।
নাজু তখন কলাবাগানের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এগোতে পারছিল না। তার পা যেন জমে গিয়েছিল। যখন সে পারভেজের মুখটা দেখল, তখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। মাটিতে বসে পড়ল। তার কান্নার শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
সে বলছিল,
“ও তো ভালো ছিল… ও তো শুধু বাঁচতে চেয়েছিল…”
কিন্তু ভালো হওয়া কি এই সমাজে অপরাধ?
পারভেজের অন্ধ বাবা তখনও জানতেন না—তার ছেলেটা আর ফিরবে না। তিনি ঘরে বসে অপেক্ষা করছিলেন। কান পেতে রেখেছিলেন—ভ্যানের শব্দ শুনবেন বলে। প্রতিটা শব্দে বুক ধক করে উঠছিল।
হঠাৎ কয়েকজন লোক এসে দাঁড়াল উঠোনে।
একজন ধীরে করে বলল,
“চাচা… আপনার ছেলের খবর পাওয়া গেছে।”
বাবা উঠে দাঁড়ালেন। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ও কোথায়?”
কেউ চোখ তুলে তাকাতে পারল না।
তখনই অন্ধ বাবা বুঝে গেলেন—এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর উত্তর।
তিনি চিৎকার করলেন না। শুধু সামনে হাত বাড়িয়ে বললেন,
“আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলো।”
যখন ছেলের নিথর দেহের পাশে তাকে দাঁড় করানো হলো, তিনি হাত দিয়ে খুঁজে খুঁজে ছেলের মুখ ছুঁলেন। ক্ষতগুলোর উপর হাত বুলিয়ে থমকে গেলেন।
তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“ও তো কথা বলতে পারত না… ও কী অপরাধ করল?”
কেউ উত্তর দেয়নি।
অন্ধ মানুষটা তখন মাটিতে বসে পড়লেন। বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না বের হতে পারছিল না। তিনি শুধু বলছিলেন,
“আমি চোখে দেখি না… তবু আমার ছেলেটাই ছিল আমার আলো।”
সেই আলো নিভে গেছে।
পারভেজের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবারের শেষ আশাটুকুও মরে গেল। ভ্যান নেই। রোজগার নেই। ঘরে খাবার নেই। অন্ধ বাবার হাতে আবার ফিরে এল ভিক্ষার থালা।
যে ছেলে ভিক্ষা থেকে সম্মানের পথে এনেছিল পরিবারকে, সেই ছেলের রক্তে ভিজে গেল সেই পথ।
গ্রামের মানুষ কয়েক দিন আলোচনা করল। তারপর সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। কেউ আর কথা বলল না। কেউ আর প্রশ্ন তুলল না।
শুধু নাজু প্রতিদিন কাঁদত। নামাজ পড়ে আবার দোয়া করত—এইবার পারভেজের জন্য নয়, তার বিচার পাওয়ার জন্য। কিন্তু বিচার আর আসে না।
পারভেজের নীরব জীবন যেমন শব্দহীন ছিল, তার মৃত্যুও তেমনই নীরবে চাপা পড়ে গেল।
কিন্তু প্রশ্নটা রয়ে গেল—
এরা কি মানুষ?
না কি মানুষ নামের অমানুষ?
এই প্রশ্নের উত্তর আজও কেউ দেয়নি।
চলবে............