ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:১২:১৪ AM

বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি:ত্যাগীদের ভবিষ্যৎ কী?

মান্নান মারুফ
09-03-2026 07:40:56 PM
বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি:ত্যাগীদের ভবিষ্যৎ কী?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে প্রশ্ন উঠেছে—দলের দুর্দিনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, আন্দোলনে রাজপথে মার খেয়েছেন এবং দীর্ঘদিন সংগঠন ধরে রেখেছেন, তাদের অনেকেই কেন নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পেলেন না।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন মন্ত্রিসভা একদিকে যেমন তরুণ নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ অনেক নেতাকে বাদ দেওয়ায় দলের ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

নতুন মুখের প্রাধান্য

নতুন মন্ত্রিসভার ৪৯ সদস্যের মধ্যে প্রায় ৪০ জনই নতুন মুখ। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও এবার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিয়েছেন।

দলের তরুণ নেতৃত্ব এবং নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়ার কৌশল হিসেবে এটিকে দেখা হলেও, অভিজ্ঞ নেতাদের বাদ পড়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও। অনেকের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের সময়কার অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি।

বাদ পড়া হেভিওয়েট নেতারা

বিএনপির নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং ড. আব্দুল মঈন খান।

এই নেতারা অতীতে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং দলীয় রাজনীতিতেও দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখে আসছেন।

এছাড়া স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এবং সেলিমা রহমানের নামও মন্ত্রিসভার তালিকায় নেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনকাল এবং খালেদা জিয়ার কারাবন্দি সময়ে দলকে সক্রিয় রাখতে এই নেতাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের বাদ পড়া অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হয়েছে।

উপদেষ্টা পদে কিছু সমন্বয়

যদিও মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি, তবু দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান এবং রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে করে অভিজ্ঞ নেতাদের সম্পূর্ণভাবে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়নি বলেই মনে করছেন অনেকে।

তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই উপদেষ্টা পদগুলো বাস্তব ক্ষমতার ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে।

মঈন খানের সংযত প্রতিক্রিয়া

মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়ার বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাওয়ার বিষয়টি দেখছেন দলের চেয়ারম্যান। এ বিষয়ে মন্তব্য না করাই ভালো।”

তার এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নেতারা প্রকাশ্যে খুব বেশি সমালোচনা করতে চাইছেন না।

যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীদের ক্ষোভ

নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে শুধু বিএনপির ভেতরেই নয়, জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যেও কিছুটা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে যেসব দল দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে আন্দোলন করেছে, তাদের অনেকেই সরকারে প্রত্যাশিত প্রতিনিধিত্ব পাননি।

গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ মন্ত্রিসভায় স্থান পেলেও অন্য অনেক নেতার নাম বাদ পড়েছে।

নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি।

সাইফুল হকের সমালোচনা

এ নিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রকাশ্যে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, “প্রথমত এটি পুরোপুরি বিএনপির সরকার। যুগপৎ আন্দোলনের মাত্র দুই-তিনজনকে রাখা হয়েছে। বাস্তবে বিএনপি যুগপৎ সঙ্গীদের বাদ দিয়েই সরকার গঠন করেছে।”

তার মতে, নতুন মন্ত্রিসভায় এক ধরনের “একলা চলো” নীতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এবং এতে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “দুর্দিনে যারা পাশে ছিল, তাদের বাদ দিয়ে সরকার গঠন করা হয়েছে। এর প্রভাব বা তাৎপর্য কিছুদিন পর বোঝা যাবে।”

খলিলুর রহমানকে ঘিরে বিতর্ক

নতুন মন্ত্রিসভার অন্যতম আলোচিত বিষয় হচ্ছে খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা।

তিনি আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

বিদেশি কোম্পানির কাছে বন্দর ইজারা দেওয়া এবং প্রস্তাবিত রোহিঙ্গা করিডোর নিয়ে বিতর্কের কারণে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী তার সমালোচনা করেছিলেন।

তবুও সংসদ সদস্য না হয়েও টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় দলের ভেতরে বিস্ময় দেখা গেছে।

যাদের কপাল খোলেনি

সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে মীর নাছির, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলু, লুৎফুজ্জামান বাবর এবং আমান উল্লাহ আমানের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি।

এছাড়া দলের দুঃসময়ের অন্যতম সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেলের নাম টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাকেও নেওয়া হয়নি।

দলের ভেতরে সম্ভাব্য প্রভাব

দলের ভেতরে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘদিন ত্যাগ স্বীকার করা নেতারা যদি উপযুক্ত মূল্যায়ন না পান, তবে তা ভবিষ্যতে সংগঠনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

দলীয় কর্মীদের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হতে পারে যে, কঠিন সময়ে রাজপথে সক্রিয় থাকার পরও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পুরস্কার নিশ্চিত নয়।

এর ফলে অনেক কর্মী হয়তো ভবিষ্যতে ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনে অংশ নিতে আগ্রহ হারাতে পারেন। আবার কেউ কেউ দলীয় কর্মসূচিতে অনুপস্থিত থাকার পথও বেছে নিতে পারেন।

নেতৃত্বের কৌশল

তবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে একটি নতুন রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে।

একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, “তারেক রহমান তার নিজের রাজনৈতিক কৌশল থেকেই মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার।”

তিনি আরও বলেন, “মর্নিং শোজ দ্য ডে”—অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের ফলাফল স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

যারা অবস্থান ধরে রেখেছেন

নতুন মন্ত্রিসভায় দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন এবং হাফিজ উদ্দিন খান।

ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে তারেক রহমান একটি নতুন প্রজন্মভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।

তবে অভিজ্ঞ নেতাদের উপেক্ষা করলে দলীয় ঐক্য ও মনোবলে প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, যদি নতুন নেতৃত্ব দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তবে এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন গতিও এনে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন মন্ত্রিসভা যেমন একদিকে রাজনৈতিক চমক সৃষ্টি করেছে, তেমনি দলীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আগামী সময়েই বোঝা যাবে এই কৌশল বিএনপির জন্য কতটা সফল হয়।