ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
সময়: ০৯:৩৭:৩১ PM

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড চুরি ঢাকতে গিয়ে সারাদেশে অসন্তোষ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
30-06-2026 07:58:29 PM
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড চুরি ঢাকতে গিয়ে সারাদেশে অসন্তোষ

দেশের বিভিন্ন এলাকায় জুন মাসের বিদ্যুৎ বিলকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকদের অভিযোগ, মে মাসের তুলনায় জুন মাসে তাদের বিদ্যুৎ বিল দ্বিগুণ, এমনকি কোথাও কোথাও তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২, নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, গোপালগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকদের কাছ থেকে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ইউনিট দেখিয়ে বিল করা, বন্ধ বা অচল মিটারে বিল প্রদান, গড় বিলের নামে অতিরিক্ত চার্জ আরোপ, বিল সমন্বয়ের অজুহাতে বাড়তি অর্থ আদায় এবং বর্ষাকালে সেচ সংযোগে ব্যবহার না থাকলেও বিল প্রদান—এসব অনিয়মের মাধ্যমে গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য হলো কাগজে-কলমে সিস্টেম লস কম দেখানো।

বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস বলতে উৎপাদিত ও সরবরাহকৃত বিদ্যুতের মধ্যে বিভিন্ন কারিগরি ও অকারিগরি কারণে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ হিসাবের বাইরে চলে যায়, তাকে বোঝায়। প্রতি অর্থবছরের শুরুতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসম্পাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এর অন্যতম সূচক হলো সিস্টেম লস কমানো। অভিযোগ উঠেছে, বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন বা বিদ্যুৎ চুরি রোধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অতিরিক্ত বিলের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে সিস্টেম লস কম দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

গ্রাহকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। একজন সাধারণ গ্রাহকের ঘরে যদি একটি বা দুটি বাতি এবং একটি ফ্যান থাকে, তাহলে মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব ব্যবহারের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ইউনিট দেখিয়ে বিল প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ করতে না পারলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি বিলম্ব ফি ও জরিমানার মুখেও পড়তে হচ্ছে তারা।

গ্রাহকদের আরও অভিযোগ, পরবর্তী মাসে অনেক সময় বিল সমন্বয় করা হলেও ততদিনে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের কারণে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এতে একদিকে পারিবারিক ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও কমছে।

অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও এবং মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের সঙ্গে গ্রাহকদের বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের অনেকেই মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, যদিও এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সরাসরি ভূমিকা নেই। এতে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরাও চরম চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা বা সহযোগিতা সব সময় পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বোর্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি পল্লী এলাকায় দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, জুন মাসজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় লাইন রক্ষণাবেক্ষণের নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। তাদের দাবি, এমন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ অপেক্ষাকৃত কম চাহিদার মৌসুমে করা সম্ভব হলেও সর্বোচ্চ গরমের সময় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

সমালোচকদের মতে, বিদ্যুৎ ব্যবহার কমে গেলে সিস্টেম লসের হারও কাগজে কম দেখানো সহজ হয়। ফলে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত রাখা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিস্টেম লস কমানোর প্রকৃত উপায় হলো পুরোনো বিতরণ লাইন সংস্কার, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, আধুনিক মিটারিং ব্যবস্থা চালু করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিদ্যুৎ চুরি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত বিলের বোঝা চাপিয়ে সিস্টেম লস কম দেখানো হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, জুন মাসে সিস্টেম লস কম দেখানো হলেও জুলাই মাসে আবার সেটি বৃদ্ধি পায়। তাদের মতে, যদি এমন প্রবণতা নিয়মিত দেখা যায়, তবে বিষয়টি স্বাধীনভাবে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন ভোক্তারা।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিমের নেতৃত্ব নিয়েও বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গ্রাহকদের অভিযোগ ও মাঠপর্যায়ের সংকট নিরসনে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও বিভিন্ন মাধ্যমে উত্থাপিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বা বোর্ডের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিম পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল প্রতিষ্ঠানটির সুশাসন নিশ্চিত করা, অতীতের অনিয়ম দূর করা এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন করা। কিন্তু সমালোচকদের দাবি, কাঙ্ক্ষিত সংস্কার দৃশ্যমান হয়নি; বরং গ্রাহকসেবা, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ খাতে জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে জরুরি হলো অতিরিক্ত বিলের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, প্রকৃত মিটার রিডিং যাচাই করা, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের দ্রুত বিল সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং সিস্টেম লস কমানোর নামে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে গ্রাহকভোগান্তি কমবে এবং বিদ্যুৎ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।