ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
সময়: ১০:৪৩:৫০ PM

বিপিসি কর্মকর্তা আহম্মদুল্লাহর সম্পদের পাহাড়

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
30-06-2026 09:21:16 PM
বিপিসি কর্মকর্তা আহম্মদুল্লাহর সম্পদের পাহাড়

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর উপব্যবস্থাপক এবং একসময় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মো. আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, নিয়োগে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সূত্র, সরেজমিন অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদ তিনি নিজের পাশাপাশি স্ত্রী, মা-বাবা ও শ্বশুরের নামে অর্জন করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আহম্মদুল্লাহ ও তার পরিবারের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও জমি রয়েছে। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী সেকশন-৬-এর সি-ব্লকের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় প্রায় ১,১৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। এছাড়া মোহাম্মদপুরে আরও একটি ফ্ল্যাট এবং আদাবরে একটি প্লটের মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে।

বিপিসির চেয়ারম্যানের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আহম্মদুল্লাহ তার স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ থানার কোন্ডা ইউনিয়নের আইন্তা মৌজায় বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে সাড়ে তিন কাঠা জমি ক্রয় করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, জমিটির প্রকৃত বাজারমূল্য অনেক বেশি হলেও নিবন্ধন দলিলে মাত্র ৩০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা মূল্য দেখানো হয়। ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যবসায়ী আবুল বশর আবুর কাছ থেকে জমিটি স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে নিবন্ধন করা হয়।

এ বিষয়ে নুসরাত জেবিন সিনথী জমি কেনার বিষয়টি স্বীকার করলেও দাবি করেন, ওই জমিতে আটতলা ভবন নির্মাণের জন্য তিনি ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করেছেন। এছাড়া আদাবরের প্লটটি প্রথমে তার বাবা অলিউল হকের নামে কেনা হলেও পরে তা তার নামে হস্তান্তর করা হয়।

শুধু রাজধানীতেই নয়, নিজ জেলা ঝালকাঠীতেও আহম্মদুল্লাহ বিপুল সম্পদের মালিক বলে অভিযোগ রয়েছে। ঝালকাঠী সদর উপজেলার দিবাকরকাঠী গ্রামে তিনি একটি দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। একই এলাকায় তার ১০ একরেরও বেশি জমি রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বরিশাল শহরে একটি ফ্ল্যাট এবং উজিরপুর কলেজসংলগ্ন এলাকায় জমি কেনার তথ্যও উঠে এসেছে।

আহম্মদুল্লাহর জীবনযাত্রা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রী ঢাকা মেট্রো-গ ৪৩-৪৭৬৯ নম্বরের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন, যার সামনে সরকারি লোগো লাগানো ছিল। অন্যদিকে আহম্মদুল্লাহ নিজে দীর্ঘদিন বিপিসির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের জন্য বরাদ্দ সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতি মাসে তার পল্লবীর বাসায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা গাড়িভর্তি উপহারসামগ্রী নিয়ে আসতেন, যা প্রতিবেশীদের মধ্যেও কৌতূহলের সৃষ্টি করে। তার সন্তান ঢাকার একটি স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, বিপিসির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার। বিপিসির অধীনে ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডার্স, এলপি গ্যাস লিমিটেড, পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি এবং স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেডসহ মোট আটটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় ও আর্থিক সিদ্ধান্তের ফাইল চেয়ারম্যানের অনুমোদনের আগে পিএসের মাধ্যমে যেত। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আহম্মদুল্লাহ বিভিন্ন ফাইল আটকে রেখে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন।

সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি জাহাজে জ্বালানি সরবরাহকারী একাধিক বাংকার ডিলারের কাছ থেকে তিনি নিয়মিত মাসোহারা গ্রহণ করতেন। একইভাবে বেসরকারি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড, পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড, অ্যাকোয়া রিফাইনারি লিমিটেড এবং বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের বিল দ্রুত অনুমোদনের বিনিময়েও নিয়মিত আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড মাসে কয়েকশ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া বিটুমিন বিতরণ, বিদেশি জাহাজের এলসি পেমেন্ট এবং বিভিন্ন আর্থিক ফাইল চেয়ারম্যানের টেবিলে পাঠানোর ক্ষেত্রেও ঘুষ ছাড়া কাজ এগোতো না—এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা। মাদারীপুরের শিবচরে একটি ফিলিং স্টেশনের অনুমোদনের ফাইল আটকে রেখে প্রায় ছয় লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে, যার লেনদেন ঢাকার একটি হোটেলে সম্পন্ন হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

আহম্মদুল্লাহর নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে তিনি সরাসরি ষষ্ঠ গ্রেডে বিপিসিতে যোগদান করেন এবং চাকরির আবেদনে নিজের প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে ঢাকার ঠিকানা ব্যবহার করেন। বিপিসির বিধিমালা অনুযায়ী চেয়ারম্যানের একান্ত সহকারীর পদটি সহকারী ব্যবস্থাপক (নবম গ্রেড) পর্যায়ের হলেও, তিনি উপব্যবস্থাপক (ষষ্ঠ গ্রেড) পদে থেকেও টানা সাড়ে ছয় বছর একই দায়িত্ব পালন করেন।

এ সময়ে তিনি বরিশাল অঞ্চলের লোকজনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি দিয়ে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তোলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিপিসির ঢাকা কার্যালয়ে পিয়ন, নিরাপত্তাকর্মী, রিসেপশনিস্ট, গাড়িচালক, ব্যক্তিগত সহকারীসহ বিভিন্ন পদে বরিশাল অঞ্চলের লোকজনের আধিক্য দেখা যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব নিয়োগের মাধ্যমে তিনি নিজের অনুগত একটি প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেন।

২০২১ সালে বিপিসির চেয়ারম্যান হিসেবে এ বি এম আজাদ দায়িত্ব গ্রহণের পর আহম্মদুল্লাহকে চট্টগ্রামে বদলির নির্দেশ দেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, তার প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপে মাত্র এক দিনের মধ্যেই সেই বদলির আদেশ বাতিল করা হয় এবং তিনি পুনরায় পিএস পদে বহাল হন। এ সময় তার অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ঢাকা রেস্ট হাউসের ইনচার্জ মো. শফিউল ইসলাম চাকরি হারান বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, বিভিন্ন ব্যাংকে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে স্বজনদের চাকরির ব্যবস্থা করার বিনিময়ে বিপিসির এফডিআর ও এসএনডি হিসাব নির্দিষ্ট ব্যাংকে স্থানান্তর করা। এ বিষয়ে গত ১ মার্চ বিপিসির সাবেক পিএস কে এম রিয়াজ রহমান জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে বলা হয়, তার দায়িত্বকালে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোতে বিপিসির বিপুল অঙ্কের আমানত রাখা হয়, যা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

এছাড়া নিয়োগ-বাণিজ্য, ডিপো ইনচার্জদের বদলির হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়, তদন্ত প্রতিবেদন জালিয়াতি এবং বিভিন্ন আর্থিক সিদ্ধান্তে অনিয়মের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে। বিপিসির হিসাব বিভাগের প্রত্যয়নপত্র অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আপ্যায়ন, টিএ/ডিএ এবং জ্বালানি বিল বাবদ তাকে ৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে।

অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ মে বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান আহম্মদুল্লাহকে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে সংযুক্ত করেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরও তার গড়ে তোলা সিন্ডিকেট বিপিসির বিভিন্ন কাজে অসহযোগিতা করে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, তিনি যোগদানের পর থেকে আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ তার কাছে আসেনি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকেও কোনো চিঠি পাওয়া যায়নি। বিপিসির বিভিন্ন আর্থিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করার পরামর্শ দেন।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে মো. আহম্মদুল্লাহর মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় বা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি। ফলে বিষয়গুলো তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই হওয়া সাপেক্ষে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।