ঢাকা, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৮:১৫ PM

উপন্যাস: লুসি নিখোঁজ

মান্নান মারুফ
09-03-2026 01:28:24 PM
উপন্যাস: লুসি নিখোঁজ

পর্ব–২

দুর্ঘটনার সেই রাতটা যেন কুদ্দুছের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত হয়ে দাঁড়াল।

অনেক খোঁজাখুঁজি করেও লুসিকে আর কোথাও পাওয়া গেল না। চারপাশে পুলিশ, কিছু কৌতূহলী মানুষ আর ভাঙা গাড়ির ধ্বংসস্তূপ—এই ছিল পুরো দৃশ্য। কিন্তু লুসি নেই। যেন পৃথিবীর বুক থেকে হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেছে সে।

কুদ্দুছ রাস্তার ধারে বসে রইল।

তার চোখের সামনে ভাঙা গাড়িটা পড়ে আছে। গাড়ির সামনের অংশ চূর্ণবিচূর্ণ। হেডলাইটের কাচ ভেঙে রাস্তার ওপর ছড়িয়ে আছে অসংখ্য টুকরো। বাতাসে পেট্রোলের তীব্র গন্ধ।

একজন পুলিশ অফিসার এসে কুদ্দুছের পাশে দাঁড়াল।

“আপনি একটু বাড়ি যান,” সে শান্ত গলায় বলল। “আমরা খোঁজ করছি।”

কুদ্দুছ মাথা তুলল না।

মনে হচ্ছিল, যদি সে এখান থেকে চলে যায়—তাহলে হয়তো লুসি ফিরে আসবে, আর তাকে না পেয়ে আবার হারিয়ে যাবে।

আরেকজন লোক এসে বলল,
“ভাই, এতক্ষণ এখানে বসে থাকলে তো কিছু হবে না। আপনি বাড়ি যান।”

কিন্তু কার কথা কে শোনে?

কুদ্দুছ যেন পাথরের মতো হয়ে বসে রইল।

লুসিকে ভালোবেসেই তো বিয়ে করেছিল সে। সেই ভালোবাসা যে একদিন এমনভাবে ভেঙে যাবে—এটা কখনও কল্পনাও করেনি।

তার মনে পড়তে লাগল লুসির মুখ।

সেই হাসি।
সেই কণ্ঠস্বর।
সেই মায়াভরা চোখ।

হঠাৎ মনে হলো—লুসি যেন খুব কাছে কোথাও আছে।

কুদ্দুছ উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাল।

অন্ধকারে দূরের গাছগুলো নড়ছে। রাতের বাতাস ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে উঠছে।

কিন্তু কোথাও লুসি নেই।

সময় ধীরে ধীরে গড়িয়ে গেল।

সন্ধ্যা নেমে এলো। আকাশের লাল আলো নিভে গিয়ে চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে গেল।

পুলিশেরা তাদের কাজ শেষ করে ধীরে ধীরে চলে যেতে শুরু করল।

কেউ একজন আবার কুদ্দুছকে বলল—
“ভাই, বাড়ি যান। আমরা খবর দেব।”

কুদ্দুছ কোনো উত্তর দিল না।

সে আবার গিয়ে সেই ভাঙা গাড়ির পাশে দাঁড়াল।

গাড়িটার দরজায় হাত রাখতেই তার বুকের ভেতর একটা ব্যথা জেগে উঠল।

এই গাড়িটা লুসি খুব ভালোবাসত।

কয়েক মাস আগে কুদ্দুছ তাকে চমক দেওয়ার জন্য গাড়িটা কিনে দিয়েছিল।

লুসি সেদিন খুশিতে চোখে পানি নিয়ে বলেছিল—
“তুমি আমাকে এত ভালোবাসো কেন?”

কুদ্দুছ হেসে বলেছিল—
“কারণ তুমি আমার পুরো পৃথিবী।”

আজ সেই পৃথিবীটাই যেন ধ্বংস হয়ে পড়ে আছে।

রাত আরও গভীর হলো।

রাস্তা প্রায় ফাঁকা। মাঝে মাঝে দূরে কোনো ট্রাকের শব্দ শোনা যায়, তারপর আবার নিস্তব্ধতা।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

তার শরীর যেন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে।

হঠাৎ সে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল—

“লুসি!”

তার কণ্ঠস্বর রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

কেউ উত্তর দিল না।

কুদ্দুছের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

সে আবার ফিসফিস করে বলল—
“তুমি কোথায় লুসি? আমি তো এখানে আছি…”

কিন্তু সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।


সেই রাতের পর শুরু হলো কুদ্দুছের এক অন্তহীন খোঁজ।

প্রথম কয়েক সপ্তাহ সে প্রায় প্রতিদিন থানায় যেত।

পুলিশ নানা জায়গায় খোঁজ করল। নদী, হাসপাতাল, আশেপাশের এলাকা—সব জায়গায় অনুসন্ধান হলো।

কিন্তু কোথাও লুসির কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না।

মাঝে মাঝে নতুন কোনো খবর আসে—
কেউ নাকি দূরের কোনো শহরে লুসির মতো একজনকে দেখেছে।

কুদ্দুছ সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ছুটে যায়।

কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়ে ফিরে আসে।

একদিন থানার একজন কর্মকর্তা তাকে শান্তভাবে বলেছিল—
“আপনাকে হয়তো বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।”

কুদ্দুছ সেই কথার কোনো জবাব দেয়নি।

বাস্তবতা?

বাস্তবতা কি এত নিষ্ঠুর হতে পারে?


মাস গড়িয়ে বছর হয়ে গেল।

প্রথম দিকে প্রতিবেশীরা প্রায়ই কুদ্দুছের খোঁজ নিতে আসত।

কেউ খাবার এনে দিত, কেউ সান্ত্বনা দিত।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সবাই নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

শুধু কুদ্দুছের জীবনটাই যেন থেমে রইল।

তাদের ছোট্ট বাড়িটা এখন ভীষণ নির্জন।

লুসির সাজানো ঘরটা এখনও আগের মতোই আছে।

ড্রেসিং টেবিলের ওপর লুসির চিরুনি পড়ে আছে। আলমারিতে তার শাড়িগুলো ভাঁজ করে রাখা।

কুদ্দুছ মাঝে মাঝে সেই ঘরে ঢুকে চুপচাপ বসে থাকে।

মনে হয়—লুসি যেন এখনই দরজা খুলে ঢুকবে।

হেসে বলবে—
“তুমি এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছ?”

কুদ্দুছ তখন চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলবে—
“আমি তো কখনও অপেক্ষা ছাড়িনি।”


একদিন সন্ধ্যায় কুদ্দুছ বারান্দায় বসে ছিল।

আকাশে মেঘ জমেছে। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।

হঠাৎ তার মনে হলো—লুসি যদি সত্যিই বেঁচে থাকে?

যদি সে কোথাও আটকে থাকে?

যদি কোনোদিন হঠাৎ ফিরে আসে?

এই আশাটুকুই তাকে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছে।

অনেকে তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছিল।

কিন্তু কুদ্দুছ কখনও রাজি হয়নি।

সে শুধু বলেছিল—
“আমার স্ত্রী এখনও নিখোঁজ। আমি তাকে মৃত বলতে পারি না।”

মানুষজন তখন চুপ হয়ে যায়।

কারণ তারা বুঝতে পারে—এই মানুষটার হৃদয়ে এখনও একটাই নাম আছে।

লুসি।


বছর কেটে গেল।

একসময় কুদ্দুছের চুলে পাক ধরল।

মুখে ক্লান্তির রেখা পড়ে গেল।

কিন্তু তার অপেক্ষা শেষ হলো না।

প্রতিদিন সকালে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে—
হয়তো আজ লুসি ফিরে আসবে।

প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে ফিসফিস করে বলে—
“যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।”


আজ বিশ বছর পরে…

মুদি দোকানের সেই ঘটনাটা আবার কুদ্দুছের জীবনকে ঝড়ের মতো নাড়িয়ে দিয়েছে।

সেই লকেট।

সেই পরিচিত গলা।

সেই অচেনা মুখের আড়ালে যেন লুকিয়ে আছে এক পুরোনো ইতিহাস।

কুদ্দুছ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—

যদি সত্যিই সে লুসি হয়?

যদি এতদিন পরে সে ফিরে এসে থাকে?

কুদ্দুছের বুকের ভেতর আবার পুরোনো সেই আশাটা জেগে উঠল।

সে ধীরে ধীরে বলল—

“লুসি…
তুমি যদি সত্যিই ফিরে এসে থাকো,
আমি তোমাকে খুঁজে বের করব।”

রাতের আকাশ নীরব।

কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে এক অজানা রহস্য।

কুদ্দুছ জানে না—

এই খোঁজ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে।

কিন্তু সে এবার থামবে না।

কারণ বিশ বছর আগে যে গল্পটা হঠাৎ থেমে গিয়েছিল—
হয়তো তার শেষ অধ্যায় এখনো লেখা বাকি।

চলবে…