ঢাকা, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:৪৮:৩৩ AM

গল্প"হারিয়েছি

মান্নান মারুফ
04-06-2026 12:19:28 PM
গল্প"হারিয়েছি

মানুষের জীবনে কিছু মানুষ আসে, যারা শুধু মানুষ হয়ে থাকে না; তারা হয়ে ওঠে অভ্যাস, প্রার্থনা, অপেক্ষা, কখনো বা পুরো একটি পৃথিবী। তাদের উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক হয়ে যায় যে একসময় মনে হয়, তারা বুঝি কোনোদিনই হারিয়ে যাবে না। অথচ জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—যাদের হারানোর কথা আমরা কল্পনাও করি না, অনেক সময় তারাই সবচেয়ে নীরবে হারিয়ে যায়।
আমি ঠিক সেই মানুষটাকেই হারিয়ে ফেলেছি, যার সঙ্গে আমার একসঙ্গে মৃত্যুর গল্প হতো।
আমাদের ভালোবাসা ছিল না চলচ্চিত্রের মতো চমকপ্রদ, ছিল না কবিতার অলংকারে মোড়ানো কোনো কল্পলোক। আমাদের ভালোবাসা ছিল খুব সাধারণ, অথচ গভীর। এতটাই গভীর যে আমরা শুধু একসঙ্গে বেঁচে থাকার নয়, একসঙ্গে বুড়িয়ে যাওয়ার, এমনকি একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার গল্পও করতাম।
রাতের শেষ প্রহরে, যখন চারপাশ ঘুমিয়ে পড়ত, আমরা ভবিষ্যতের অদ্ভুত সব কল্পনা নিয়ে কথা বলতাম। সে বলত, “যদি কোনোদিন আমি আগে চলে যাই?”
আমি অভিমান করে বলতাম, “তাহলে আমিও বেশিদিন থাকব না।”
সে হাসত। সেই হাসির মধ্যে ছিল শিশুর সরলতা আর সমুদ্রের গভীরতা। আমি তখন ভাবতাম, পৃথিবীতে যতদিন ভালোবাসা থাকবে, ততদিন এই মানুষটাও আমার পাশে থাকবে।
কিন্তু জীবন কখনো কখনো মানুষের বিশ্বাসকে সবচেয়ে নিষ্ঠুরভাবে ভেঙে দেয়।
আমি আজও মনে করতে পারি, তার সঙ্গে কথা না হলে কেমন অস্থির হয়ে উঠতাম। দিনের ভেতর কতবার যে তার নাম স্ক্রিনে খুঁজেছি, তার হিসাব নেই। তার একটি বার্তা, একটি কল, কিংবা একটি ছোট্ট “কেমন আছ?”—আমার পুরো দিন বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
মানুষ বলে ভালোবাসা নাকি হৃদয়ে অনুভূত হয়।
আমার মনে হতো, ভালোবাসা আসলে শরীরেও অনুভূত হয়। কারণ তার সঙ্গে কথা না হলে আমার হাত কাঁপত, বুকের ভেতর অকারণ শূন্যতা তৈরি হতো, আর পৃথিবীটাকে অদ্ভুত নিস্তব্ধ মনে হতো।
সে ছিল আমার প্রতিদিনের অভ্যাস।
সকালের প্রথম শুভেচ্ছা থেকে রাতের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত, প্রতিটি মুহূর্তে তার উপস্থিতি ছিল।
তার সঙ্গে আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে ছোট ছোট গল্প আঁকতাম।
সেই গল্পগুলো খুব বিলাসী ছিল না।
একটি ছোট্ট বাড়ি, বারান্দায় দুটো চেয়ার, বিকেলের চা, বর্ষার দিনে ভেজা বাতাস, আর পাশাপাশি বসে নীরবতা উপভোগ করার মতো কিছু সাধারণ স্বপ্ন ছিল সেখানে।
সে বলত, “আমাদের বাড়িতে অনেক বই থাকবে।”
আমি বলতাম, “আর জানালার পাশে তোমার প্রিয় ফুলগুলো।”
সে হেসে বলত, “তুমি এত সাধারণ কেন?”
আমি উত্তর দিতাম, “কারণ আমার সমস্ত অসাধারণত্ব তুমি।”
আজ ভাবি, কত সহজ ছিল সেই স্বপ্নগুলো।
তবুও জীবন সেগুলো পূরণ হতে দিল না।
একদিন হঠাৎ করেই বুঝতে পারলাম, মানুষের দূরে চলে যাওয়ার জন্য সব সময় কোনো বড় কারণ লাগে না।
কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে বড় দূরত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
আগে যে মানুষটি দিনের প্রতিটি গল্প শুনতে চাইত, সে ধীরে ধীরে নীরব হয়ে গেল।
আগে যে মানুষটি আমার কষ্টে কেঁদে ফেলত, সে একসময় আমার কান্নার শব্দও শুনতে পেল না।
আমি বারবার ভেবেছি, কোথায় ভুল ছিল?
ভালোবাসায়?
ভাগ্যে?
নাকি সময়ের কাছে আমরা দুজনেই পরাজিত হয়ে গিয়েছিলাম?
আজও তার উত্তর খুঁজে পাই না।
শুধু জানি, একদিন আমি তাকে হারিয়ে ফেলেছি।
কোনো ঝড় ছাড়াই।
কোনো বিদায় ছাড়াই।
কোনো অভিযোগ ছাড়াই।
যেভাবে শরতের শেষ বিকেলে একটি শুকনো পাতা নিঃশব্দে গাছ থেকে ঝরে পড়ে, সেভাবেই সে আমার জীবন থেকে ঝরে পড়েছিল।
তারপর অনেক দিন কেটে গেছে।
ঋতু বদলেছে।
মানুষ বদলেছে।
আমার চারপাশের পৃথিবীও বদলে গেছে।
কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনো বদলায় না।
আজও কোনো পরিচিত গান শুনলে তার কথা মনে পড়ে।
আজও বৃষ্টির গন্ধ পেলে মনে হয়, সে বুঝি পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
আজও কোনো বইয়ের পাতায় সুন্দর কোনো লাইন পড়লে মনে হয়, তাকে শোনানো উচিত ছিল।
এই “উচিত ছিল” শব্দ দুটোই বোধহয় সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
কারণ এই শব্দের ভেতরে অসংখ্য অপূর্ণতা লুকিয়ে থাকে।
অনেক মানুষ আমার জীবনে এসেছে।
কেউ বন্ধুত্ব নিয়ে এসেছে।
কেউ মুগ্ধতা নিয়ে এসেছে।
কেউ হয়তো ভালোবাসার দাবিও করেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কাউকে আর আপন মনে হয়নি।
আমি সবার সঙ্গে কথা বলেছি, হেসেছি, সময় কাটিয়েছি; অথচ হৃদয়ের ভেতরে একটি জায়গা সবসময় খালি রয়ে গেছে।
সেই জায়গাটি শুধু একজন মানুষের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
যে মানুষটি আর আমার নয়।
মানুষ ভাবে, সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়।
আমি মনে করি, সময় ক্ষত সারায় না।
সময় শুধু মানুষকে ক্ষতের সঙ্গে বাঁচতে শিখিয়ে দেয়।
আমিও শিখে গেছি।
এখন আর মাঝরাতে কাঁদি না।
এখন আর প্রতিদিন তার পুরোনো বার্তা পড়ি না।
এখন আর অপেক্ষা করি না।
কিন্তু ভুলেও যাইনি।
কারণ কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না।
তারা স্মৃতি হয়ে থাকে না; তারা আত্মার ভেতরে স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে নেয়।
কখনো কখনো গভীর রাতে আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখি।
অসংখ্য তারার ভিড়ে কোনো একটি তারা দেখে মনে হয়, হয়তো সেও কোথাও একই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে।
হয়তো সেও কোনো পুরোনো স্মৃতির কাছে হেরে যাচ্ছে।
হয়তো সেও কোনো অপূর্ণ গল্প মনে করছে।
আবার হয়তো কিছুই করছে না।
হয়তো সে আমাকে অনেক আগেই ভুলে গেছে।
এই ভাবনাটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
কারণ ভালোবাসা হারানোর চেয়েও ভয়ংকর হলো—কোনো একদিন কারও স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যাওয়া।
তবুও আমি তার প্রতি রাগ করতে পারি না।
অভিমান আছে।
প্রচণ্ড অভিমান আছে।
কিন্তু ঘৃণা নেই।
কারণ যাকে সত্যিকারের ভালোবাসা যায়, তাকে ঘৃণা করার ক্ষমতা মানুষ হারিয়ে ফেলে।
আজও যদি সে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি আমাকে মনে রেখেছ?”
আমি হয়তো হাসব।
তারপর বলব—
“ভুলে যাওয়ার জন্য তো মানুষকে আগে হারাতে হয়। তুমি তো আজও আমার ভেতরে বেঁচে আছ।”
হয়তো সে বুঝবে না।
হয়তো বোঝার প্রয়োজনও নেই।
কিছু ভালোবাসা পূর্ণতার জন্য জন্মায় না।
কিছু ভালোবাসা শুধু স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকার জন্য জন্মায়।
আমাদের ভালোবাসাও হয়তো তেমনই ছিল।
অসমাপ্ত।
অপূর্ণ।
তবুও সুন্দর।
আজও সেই মানুষটার স্মৃতিতেই আমি নিঃস্ব হয়ে যাই।
অনেক মানুষ আসে, অনেক মানুষ চলে যায়।
জীবনের মেলায় প্রতিদিন নতুন মুখের ভিড় বাড়ে।
তবুও কাউকে আর আপন মনে হয় না।
কারণ আমি ঠিক সেই মানুষটাকেই হারিয়ে ফেলেছি, যে একসময় আমার প্রতিটি দিনের কারণ ছিল।
যার হাসিতে সকাল হতো।
যার কণ্ঠে সন্ধ্যা নেমে আসত।
যার উপস্থিতিতে পৃথিবীটাকে বাসযোগ্য মনে হতো।
আমি ঠিক সেই মানুষটাকেই হারিয়ে ফেলেছি, যে ছিল আমার সমস্ত স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু, আমার সমস্ত অনুভূতির আশ্রয়, আমার সমস্ত ভালোবাসার শেষ ঠিকানা।
মানুষ বলে, পৃথিবীতে সব হারিয়ে গেলেও জীবন থেমে থাকে না।
হয়তো সত্যিই থেমে থাকে না।
আমিও বেঁচে আছি।
হাঁটছি।
হাসছি।
কথা বলছি।
সবকিছুই করছি।
শুধু একটি জিনিস আর কখনো করতে পারিনি—
কাউকে তার মতো করে ভালোবাসতে পারিনি।
কারণ পৃথিবীতে মানুষ অনেক আসে, কিন্তু পুরো পৃথিবী হয়ে ওঠার ক্ষমতা সবার থাকে না।
আর আমি হারিয়েছি সেই মানুষটিকে, যে একদিন আমার পুরো পৃথিবী ছিল।
তাই আজও হৃদয়ের গভীরে একটি নাম নীরবে জেগে থাকে, একটি স্মৃতি নিঃশব্দে শ্বাস নেয়, আর একটি অসমাপ্ত গল্প প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নেয়।
সেই গল্পের নাম— হারিয়েছি।

সমাপ্ত।।