ঢাকা, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৪৭:৪৬ AM

ইউসুফের ইশারায় চলছে মুদ্রণ অধিদপ্তর

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
04-08-2026 05:03:07 PM
ইউসুফের ইশারায় চলছে মুদ্রণ অধিদপ্তর

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) মুহাম্মদ ইউসুফ এবং উপপরিচালক (যুগ্মসচিব) ব্রেনজন চাম্বুগংয়ের বিরুদ্ধে টেন্ডার অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, সিন্ডিকেট গঠন ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া একটি অভিযোগপত্রে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফ দাবি করেছেন, সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বসুন্ধরা পেপার মিলস লিমিটেড ব্যাংক-সংক্রান্ত দায়বদ্ধতার কারণে বিভিন্ন সরকারি দরপত্রে অংশ নিতে না পেরে নতুন প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা ফাইন পেপার নামে দরপত্রে অংশ নেয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকলেও এবং প্রথম দফার দরপত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল না আসায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে প্রায় ৯ কোটি টাকার কার্যাদেশ প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এ প্রক্রিয়ায় পরিচালক ইউসুফকে সহযোগিতা করেন উপপরিচালক ব্রেনজন চাম্বুগং।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সিএন্ডএফ এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রেও পরিচালকের পছন্দের প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত না হওয়ায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই অল্প সময়ের মধ্যে মূল্যায়ন সম্পন্ন করে তাসমি এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এছাড়া জিকে ট্রেড, টিআর এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকলেও ঘুষের বিনিময়ে তাদের বিভিন্ন সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সিন্ডিকেট ভাঙার নামে নতুন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে। এই সিন্ডিকেট সরকারি ডায়েরি, কলম, ডাস্টার, কাপড়, পেলেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহের কোটি কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। সরকারি ডায়েরি ক্রয়ের সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত নমুনা গোপন রেখে শুধু একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তা দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এর ফলে বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে নিম্নমানের ডায়েরি সরবরাহ করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

বালাম বই মুদ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় আইজিআর অ্যাজুরলেড কাগজ ক্রয়ের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত চাহিদা দেখিয়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকার দরপত্র বসুন্ধরা ফাইন পেপারকে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে একই ধরনের কাগজের প্রতি রিম ৬ হাজার ৮০০ টাকায় ক্রয় করা হলেও পরে প্রায় ১৬ হাজার রিম কাগজ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দামে কেনা হয়, যার ফলে সরকারের প্রায় আড়াই কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া প্রায় ১৮ কোটি টাকার কার্টিজ কাগজ ক্রয়ের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সমঝোতার অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, দরপত্রের বিভিন্ন শর্ত সংশোধনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের আওতাধীন বাংলাদেশ স্টেশনারী অফিসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দলিল লেখার কাগজ ক্রয়ে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মজুত মালামাল পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই শেষে দাখিল করা এক প্রতিবেদনে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফ অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্য প্রশংসা করেছিলেন। ২০২২ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক (উপসচিব) থাকাকালে পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তাঁর কয়েকটি মন্তব্য নিয়েও সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছিল।

এ বিষয়ে পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফ বলেন, “সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ায় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।”

এদিকে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-২ মো. আশরাফুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ৩০ জুন মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়।

মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী পরিচালকের বিরুদ্ধে তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত করা যায় না। এছাড়া অভিযোগকারীর পরিচয় স্পষ্ট না হওয়ায় কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে চলতি সপ্তাহেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।”

উল্লেখ্য, অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত সম্পন্ন হয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।