পর্ব – ৩
“তুমি কি জানো?”
তোমার হাসিতে নেহা লুকিয়ে থাকে হাজারো স্বপ্নের ছবি,
তোমার কথা ভাবলেই নেহা আমি যেন থেমে যায়—হয়ে যাই কবি।
তুমি কি জানো?
রাতটা কেটে গেল, কিন্তু ঘুম এল না আরিয়ানের চোখে।
জানালার পাশে বসে সে বারবার সেই ছোট্ট বাক্সটার দিকে তাকাচ্ছিল।
নেহা বলেছিল—“যখন মনে হবে, তুমি আমাকে সত্যিই বুঝতে পেরেছো, তখন খুলবে।”
কিন্তু মানুষ কি কখনো কাউকে পুরোপুরি বুঝতে পারে?
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তার মনে হচ্ছিল, সে যতই নেহার কাছে যাচ্ছে, ততই যেন নতুন নতুন রহস্যের মুখোমুখি হচ্ছে।
বাক্সটা তার টেবিলের ওপর রাখা, অথচ যেন তার সমস্ত চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
পরদিন সকালটা অন্যরকম ছিল।
শহরের ব্যস্ততা, রাস্তায় মানুষের ভিড়—সবকিছু আগের মতোই, কিন্তু আরিয়ানের ভেতরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন।
সে নিজেকে আয়নায় দেখে থমকে গেল।
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখের গভীরে একটা নতুন আলো—
যেন কেউ সেখানে স্বপ্ন এঁকে দিয়ে গেছে।
“আমি কি সত্যিই বদলে যাচ্ছি?”—নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।
তারপর হালকা করে হাসল—
“হয়তো… নেহার জন্যই।”
সেদিন বিকেলে সে আবার গেল “নীলতারা”-য়।
নদীর ধারে সেই পুরোনো বাড়ি, বাতাসে হালকা শীতলতা—সবকিছু যেন তাকে টানছিল।
কিন্তু আজ দরজাটা বন্ধ।
আরিয়ান একটু অবাক হলো।
সে নক করল—কোনো উত্তর নেই।
আবার করল—তবুও না।
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
“নেহা?”—সে ডাকল।
নীরবতা।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল দরজার পাশে একটা কাগজ।
সে সেটা তুলে নিল।
লেখা—
“সবসময় কাছে থাকাটা ভালোবাসা না,
কখনো কখনো দূরে থেকেও কেউ খুব আপন হয়ে যায়।
আজ আমাকে খুঁজো না…
— নেহা”
আরিয়ানের মনে যেন হঠাৎ করে শূন্যতা নেমে এল।
“আবার?”—নিজের মনেই বলল সে।
কেন নেহা বারবার এভাবে হারিয়ে যায়?
কেন সে সবকিছু সরাসরি বলে না?
সে ধীরে ধীরে নদীর ধারে গিয়ে বসে পড়ল।
পানি বয়ে যাচ্ছে, সময় এগিয়ে যাচ্ছে—
কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, তার জীবন যেন কোথাও আটকে গেছে।
নেহার কথা ভাবলেই তার মনে হয়—
সময় থেমে যায়।
সে নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল—
“তুমি কি জানো, নেহা? তোমার কথা ভাবলেই আমি অন্য মানুষ হয়ে যাই…”
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল নেহার হাসি।
সেই হাসিতে যেন সত্যিই হাজারো স্বপ্ন লুকিয়ে আছে।
হঠাৎ তার মনে পড়ল—বাক্সটা!
সে দ্রুত বাড়ি ফিরে এল।
ঘরে ঢুকেই টেবিলের ওপর রাখা বাক্সটা হাতে নিল।
অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইল।
“আমি কি ওকে বুঝতে পেরেছি?”—নিজেকে প্রশ্ন করল।
হয়তো পুরোপুরি না…
কিন্তু সে বুঝতে পেরেছে, নেহা তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তারপর ধীরে ধীরে বাক্সটা খুলল।
ভেতরে একটা পুরোনো ডায়েরি।
নীল কভার, একটু ছেঁড়া, কিন্তু খুব যত্ন করে রাখা।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“যে আমাকে সত্যিই বুঝবে, সে-ই এই গল্পের শেষটা জানবে…”
আরিয়ানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে পাতা উল্টাতে শুরু করল।
ডায়েরির পাতাগুলোতে নেহার হাতের লেখা।
প্রথম কয়েকটা পাতা ছিল তার ছোটবেলার গল্প—
তার একাকীত্ব, তার স্বপ্ন, তার হারানো মুহূর্তগুলো।
কিন্তু তারপর…
একটা জায়গায় এসে আরিয়ান থমকে গেল।
লেখা—
“আমি খুব বেশি সময় পাইনি কখনো।
ডাক্তার বলেছে, আমার হৃদয়টা দুর্বল…
হয়তো খুব বেশি দিন বাঁচব না।”
আরিয়ানের হাত কেঁপে উঠল।
“না… এটা হতে পারে না…”
সে দ্রুত পড়তে লাগল।
“আমি কাউকে আমার জীবনে আনতে চাইনি, কারণ জানতাম, চলে যেতে হবে।
কিন্তু আরিয়ানকে দেখে কেন জানি না, নিজেকে আটকাতে পারিনি…”
আরিয়ানের চোখে জল এসে গেল।
“তুমি কি জানো, আরিয়ান?
তোমার সাথে কথা বললেই মনে হয়, আমি বেঁচে আছি…
পুরোপুরি বেঁচে আছি।”
আরিয়ান ডায়েরিটা বন্ধ করে ফেলল।
তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
সবকিছু যেন এক মুহূর্তে বদলে গেল।
নেহার সেই রহস্যময় আচরণ, হঠাৎ হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া—সবকিছুর উত্তর যেন সে পেয়ে গেল।
কিন্তু এই উত্তরটা সে চাইনি।
“না, আমি এটা মেনে নিতে পারব না…”—সে বলল।
সে উঠে দাঁড়াল।
তার মনে হচ্ছিল—এখনই তাকে নেহার কাছে যেতে হবে।
এই মুহূর্তেই।
রাত হয়ে গেছে, তবুও সে ছুটল “নীলতারা”-র দিকে।
নদীর ধারে পৌঁছে সে দেখল—দরজা খোলা।
ভেতরে আলো জ্বলছে।
সে দৌড়ে ঢুকল।
“নেহা!”
নেহা পিয়ানোর পাশে বসে ছিল।
সে ধীরে মাথা তুলল।
“তুমি… ডায়েরিটা পড়েছো?”
আরিয়ান তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“তুমি আমাকে কেন বলোনি?”
নেহা হালকা হাসল—
“বললে কি তুমি দূরে চলে যেতে?”
“না!”
“মিথ্যে বলো না, আরিয়ান… সবাই ভয় পায় এমন সত্য শুনে।”
“আমি না!”
নেহা উঠে দাঁড়াল।
তার চোখে জল, কিন্তু ঠোঁটে হাসি।
“তুমি কি জানো? আমি চাইনি, তুমি আমাকে করুণা করো।”
“এটা করুণা না… এটা ভালোবাসা!”
এই প্রথমবার আরিয়ান নিজের অনুভূতিটা স্বীকার করল।
ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল।
নেহা চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো?”—সে ধীরে জিজ্ঞেস করল।
আরিয়ান এক পা এগিয়ে এসে বলল—
“হ্যাঁ। হয়তো আমি দেরিতে বুঝেছি… কিন্তু এটা সত্যি।”
নেহার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“কিন্তু আমার সময় খুব কম…”—সে বলল।
“আমার যতটুকু সময় আছে, আমি তোমার সাথে থাকতে চাই।”
“আরিয়ান…”
“না, আজ তুমি কিছু বলবে না।
আজ শুধু শুনবে—
তুমি আমার জীবনের সেই অংশ, যাকে আমি হারাতে চাই না, যতই সময় কম হোক।”
নেহা ধীরে তার হাতটা ধরল।
“তুমি কি জানো?
তোমার সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আমার কাছে একেকটা জীবনের সমান…”
আরিয়ান তার হাত শক্ত করে ধরল।
“তাহলে আমরা প্রতিটা মুহূর্তকে জীবন বানাবো।”
বাইরে রাত গভীর হয়ে এসেছে।
নদীর পানি ধীরে বইছে, আকাশে তারা জ্বলছে।
ভেতরে দু’জন মানুষ—
যারা জানে, সময় খুব কম,
তবুও ভালোবাসা থামাতে পারে না।
কিন্তু এই গল্পের শেষ কোথায়?
সময় কি সত্যিই তাদের আলাদা করে দেবে?
নাকি ভালোবাসা সবকিছুকে হার মানাবে?
আরিয়ান জানে না।
কিন্তু সে জানে—
এবার সে আর একা না।
(চলবে…)