উপন্যাস:একাকী মনে
পর্ব–৪
“নেহা, এই হৃদয়টা আজ তোমারই গল্পে ভরা,
নীরব রাতে, একাকী মনে
তোমার নামই বাজে সুরের ধারা।”
রাতটা যেন আজ অন্যরকম। আকাশে চাঁদ নেই, তবুও চারপাশে এক অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে আছে। হয়তো সেটা বাইরের আলো নয়, অন্তরের। নেহা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, হালকা বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছে, আর তার চোখে জমে আছে এক সমুদ্র স্মৃতি।
এই গুলো সে আজ প্রথমবার লিখেনি। বহু রাতের জমে থাকা অনুভূতির প্রকাশ এগুলো। প্রতিটি শব্দে আছে “আরিয়ানের ছোঁয়া, প্রতিটি লাইনে লুকিয়ে আছে তাদের অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প।
“আরিয়ান… নামটা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে নেহার। যেন কোথাও একটা সুর বেজে ওঠে, যা শুধু সে-ই শুনতে পায়।
চার বছর আগের সেই দিনটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে তার। কলেজের প্রথম দিন। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, আর তার মাঝেই হঠাৎ দেখা সেই ছেলেটার সঙ্গে। “আরিয়ান তখন সবার থেকে আলাদা—চুপচাপ, নিজের মতো থাকা, অথচ তার চোখে ছিল এক গভীরতা, যা কাউকে না কাউকে টানবেই।
নেহারও হয়েছিল ঠিক তাই।
প্রথমে শুধু দূর থেকে দেখা, তারপর চোখাচোখি, তারপর একদিন হঠাৎ লাইব্রেরিতে পাশাপাশি বসা। কথাটা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে—
“এই বইটা কি তুমি নেবে?”
“আরিয়ান একটু হেসে বলেছিল, “তুমি চাইলে আগে তুমি পড়তে পারো।”
সেই ছোট্ট কথোপকথনই যেন হয়ে উঠেছিল তাদের গল্পের শুরু।
দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল, আর তাদের সম্পর্কও অদ্ভুতভাবে গভীর হয়ে উঠছিল। তারা কেউ কাউকে ভালোবাসি বলেনি, কিন্তু দুজনেই বুঝত—কিছু একটা আছে, যা শুধু বন্ধুত্ব নয়।
একদিন বৃষ্টিভেজা বিকেলে, কলেজ থেকে ফেরার পথে, “আরিয়ান হঠাৎ বলেছিল,
“নেহা, কখনো কি মনে হয়, কিছু অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করা যায় না?”
নেহা তাকিয়েছিল তার দিকে। ভিজে চুল, চোখে অদ্ভুত এক প্রশ্ন।
“হয়তো যায় না,” সে ধীরে বলেছিল, “তবে অনুভব করা যায়।”
“আরিয়ান কিছু বলেনি। শুধু তার হাতটা এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে ছিল।
সেই স্পর্শটাই যেন সব বলে দিয়েছিল।
কিন্তু ভালোবাসার গল্পগুলো সবসময় সহজ হয় না।
“আরিয়ানের জীবনে ছিল অনেক দায়িত্ব। পরিবার, সংগ্রাম, নিজের স্বপ্ন—সবকিছু মিলিয়ে সে যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলছিল। আর সেই হারিয়ে যাওয়ার মাঝেই কোথাও নেহাকেও দূরে সরিয়ে দিতে শুরু করেছিল।
প্রথমে ফোন কম, তারপর মেসেজের উত্তর দেরিতে, তারপর একদিন পুরোপুরি নীরবতা।
নেহা অনেকবার চেষ্টা করেছিল কথা বলতে। কিন্তু “আরিয়ান সবসময় এড়িয়ে গেছে।
শেষবার যখন তারা দেখা করেছিল,“আরিয়ান শুধু বলেছিল,
“নেহা, কিছু সম্পর্ক দূরে থাকলেই ভালো থাকে।”
এই কথাটা যেন ছুরির মতো কেটে গিয়েছিল নেহার হৃদয়ে।
“কিন্তু কেন?”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠেছিল।
“আমি কি কোনো ভুল করেছি?”
“আরিয়ান চোখ নামিয়ে বলেছিল,
“না, তুমি নয়… ভুলটা আমার।”
তারপর সে চলে গিয়েছিল।
সেদিনের পর থেকে নেহার জীবন যেন থমকে গিয়েছিল। চারপাশে সবকিছু আগের মতোই ছিল, কিন্তু তার ভেতরে সবকিছু বদলে গিয়েছিল।
রাতগুলো হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে কঠিন। যখন চারপাশে নীরবতা নেমে আসে, তখনই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে অর্ণবকে।
আজও ঠিক তেমনই একটা রাত।
নেহা আবার ডায়েরিটা খুলে। সেই পুরোনো পৃষ্ঠাগুলো, যেখানে “আরিয়ানের জন্য লেখা অসংখ্য অপ্রকাশিত কথা জমে আছে।
হঠাৎ একটা পৃষ্ঠায় চোখ আটকে যায়—
“যদি কখনো তুমি ফিরে আসো, আমি আবারও নতুন করে শুরু করতে রাজি আছি।”
নেহা হালকা হাসে।
“আমি এখনো সেই জায়গাতেই আছি, “আরিয়ান,” সে মনে মনে বলে।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে।
অজানা নম্বর।
একটু দ্বিধা নিয়ে কলটা রিসিভ করে সে।
“হ্যালো?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর একটা পরিচিত কণ্ঠ—
“নেহা… কেমন আছো?”
নেহার বুকের ভেতরটা যেন থেমে যায়।
“আরিয়ান।
চার বছর পর, সেই একই কণ্ঠ, একই অনুভূতি।
“ভালো,” সে সংক্ষেপে বলে। “তুমি?”
“জানি না,” “আরিয়ান হেসে বলে, “হয়তো ভালো থাকার অভিনয় করছি।”
নেহা কিছু বলে না।
“আমি কি… তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারি?”
“আরিয়ানের কণ্ঠে একটা অদ্ভুত অনুরোধ।
নেহা জানালার বাইরে তাকায়। রাতটা এখনো নীরব, কিন্তু তার ভেতরে ঝড় উঠেছে।
“কেন?”
সে ধীরে জিজ্ঞেস করে।
“আরিয়ান একটু চুপ থেকে বলে,
“কারণ কিছু গল্প শেষ করার আগে একবার বলা দরকার—কেন শুরু হয়েছিল।”
পরদিন বিকেলে তারা দেখা করে সেই পুরোনো জায়গায়—কলেজের পাশের ছোট্ট পার্কে।
সবকিছু যেন একই রকম আছে, শুধু তারা দুজন বদলে গেছে।
“আরিয়ান আগের চেয়ে অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে। চোখের নিচে কালি, কিন্তু সেই গভীরতা এখনো আছে।
“ধন্যবাদ, আসার জন্য,” সে বলে।
নেহা হালকা মাথা নাড়ে।
“বল, কী বলতে চাও।”
“আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর ধীরে বলে—
“আমি তোমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম, কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
“ভয়?”
নেহার কণ্ঠে বিস্ময়।
“হ্যাঁ,” “আরিয়ান বলে, “আমি জানতাম, আমি তোমাকে সেই জীবনটা দিতে পারবো না, যেটা তুমি ডিজার্ব করো। আমি নিজের লড়াইয়েই এত ব্যস্ত ছিলাম, যে তোমাকে কষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারতাম না।”
নেহা শান্তভাবে শুনছিল।
“কিন্তু তুমি কি কখনো ভেবেছো,” সে ধীরে বলে,
“আমি তোমার পাশে থাকলেই হয়তো সবকিছু সহজ হয়ে যেত?”
“আরিয়ান চুপ করে যায়।
“তুমি সিদ্ধান্তটা একাই নিয়েছিলে,” নেহা বলে,
“আমাকে কোনো সুযোগই দাওনি।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর “আরিয়ান বলে—
“আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি, নেহা।”
এই কথাটা যেন সময়কে থামিয়ে দেয়।
নেহার চোখে জল চলে আসে।
“ভালোবাসা শুধু অনুভূতি না, “আরিয়ান,” সে বলে,
“এটা দায়িত্বও।”
অর্ণব মাথা নিচু করে।
“আমি জানি,” সে বলে, “এবং এবার আমি পালাতে চাই না।”
নেহা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
চার বছরের কষ্ট, অপেক্ষা, অভিমান—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে সামনে এসে দাঁড়ায়।
“তুমি কি সত্যিই বদলেছো?”
সে জিজ্ঞেস করে।
“আরিয়ান ধীরে বলে,
“আমি চেষ্টা করছি। আর যদি তুমি পাশে থাকো, তাহলে হয়তো পুরোপুরি পারবো।”
নেহা হালকা হাসে।
“জানো,” সে বলে,
“এই চার বছরে আমি অনেক কিছু শিখেছি। সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—নিজেকে ভালোবাসতে হয়।”
“আরিয়ান মাথা তোলে।
“তাহলে?”
তার কণ্ঠে আশঙ্কা।
নেহা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে—
“আমরা আবার শুরু করতে পারি… কিন্তু এবার ধীরে।”
অর্ণবের চোখে এক ঝলক আলো দেখা যায়।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ,” নেহা বলে,
“কিন্তু এবার কোনো পালানো নয়, কোনো নীরবতা নয়। যা কিছু হবে, আমরা একসাথে মোকাবিলা করবো।”
“আরিয়ান মাথা নাড়ে।
“প্রমিস।”
সূর্যটা তখন ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে। আকাশে লালচে আভা।
নেহা মনে মনে ভাবে—
হয়তো সব গল্প শেষ হয়ে যায় না, কিছু গল্প শুধু নতুন করে শুরু হয়।
আর সেই শুরুটা হয় ঠিক এমনই এক নীরব বিকেলে, যেখানে পুরোনো কষ্ট আর নতুন আশার মাঝে একটা সেতু তৈরি হয়।
রাতে ফিরে এসে নেহা আবার ডায়েরিটা খুলে।
নতুন একটা পৃষ্ঠা।
সে লিখতে শুরু করে—
“আজ আবার তোমার গল্পে ভরেছে আমার হৃদয়,
নীরব রাতে, একাকী মনে—
তবে এবার একাকীত্বে নয়,
আছে নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি।”
কলমটা থেমে যায়।
নেহা জানালার বাইরে তাকায়।
আজ আকাশে চাঁদ উঠেছে।
হয়তো সত্যিই—সব অন্ধকারের পর একদিন আলো আসেই।
চলবে.....