ঢাকা, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬,
সময়: ১০:৩৬:২৩ PM

উপন্যাস: শেষ নিঃশ্বাস

মান্নান মারুফ
29-03-2026 08:33:26 PM
উপন্যাস: শেষ নিঃশ্বাস

পর্ব–১

কাকে বলবে কুদ্দুছ ভালো নেই। কোথায় রাখবে ভারী হয়ে ওঠা নিঃশ্বাসগুলো। কার কাঁধে মাথা রাখলে একটু কষ্টটা হালকা হবে তার। শহরের এই ভিড়ের মাঝেও আজ সে নিঃসঙ্গ। মানুষের কোলাহল, গাড়ির হর্ন, দোকানের আলো—সবকিছুই যেন তার জন্য অর্থহীন হয়ে গেছে। মনে হয়, এই শহর তাকে চেনে না, কিংবা সে-ই ভুলে গেছে শহরের ভাষা। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারী নিঃশ্বাসগুলো যেন প্রতিটি মুহূর্তে তাকে একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কুদ্দুছ দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সন্ধ্যার লালচে আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। ঠিক তার জীবনটার মতো—একসময় উজ্জ্বল ছিল, আর এখন শুধু অন্ধকার।

এই অন্ধকারের নাম—মায়া।

মায়া তার জীবনে এসেছিল হঠাৎ করেই, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই। সেদিনও এমনই এক সন্ধ্যা ছিল। হালকা বৃষ্টি পড়ছিল, বাতাসে কেমন এক স্নিগ্ধতা। কুদ্দুছ তখন অফিস থেকে ফিরছিল ক্লান্ত শরীরে। রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাওয়ার সময়ই প্রথম দেখেছিল তাকে।

মায়া ভিজে চুলগুলো কাঁধে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখে অদ্ভুত এক গভীরতা, ঠোঁটে মৃদু হাসি। সেই হাসি যেন কোনো অজানা গল্প বলছিল। কুদ্দুছ অকারণেই তাকিয়ে ছিল তার দিকে, যেন সময় থেমে গেছে।

“এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”—হঠাৎ মায়ার প্রশ্নে চমকে উঠেছিল সে।

কুদ্দুছ একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করেছিল।
“না… কিছু না।”

মায়া হেসে বলেছিল, “আপনি তো পুরো ভিজে গেছেন! ঠান্ডা লাগবে কিন্তু।”

সেই একটুখানি যত্ন, সেই সাধারণ কথাটাই যেন কুদ্দুছের জীবনে অসাধারণ হয়ে উঠেছিল।

এরপর শুরু হয়েছিল তাদের গল্প। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও তারা খুঁজে নিত একটু সময়—এক কাপ চা, কিছু কথা, আর কিছু নীরবতা ভাগ করে নেওয়ার জন্য। ধীরে ধীরে তারা একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে উঠলো।

মায়া কথা বলতে ভালোবাসতো। ছোট ছোট বিষয়েও সে আনন্দ খুঁজে পেত। আর কুদ্দুছ? সে বেশি কথা বলতো না, কিন্তু মায়ার কথা শুনতে ভালো লাগতো। মনে হতো, এই মেয়েটা তার জীবনের শূন্য জায়গাগুলো ভরে দিচ্ছে।

একদিন বিকেলে তারা নদীর ধারে বসেছিল। সূর্য তখন ডুবে যাচ্ছিল, আকাশ লাল হয়ে উঠেছিল।

মায়া হঠাৎ বললো,
“তুমি কি কখনো ভেবেছো, আমাদের গল্পটা কোথায় গিয়ে শেষ হবে?”

কুদ্দুছ একটু চমকে তাকালো।
“শেষ কেন হবে?”

মায়া মৃদু হাসলো।
“সব গল্পেরই তো একটা শেষ থাকে।”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,
“আমি চাই না আমাদের গল্প শেষ হোক।”

মায়া তার দিকে তাকিয়ে রইলো। সেই দৃষ্টিতে ছিল মায়া, ছিল ভয়, আর ছিল এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা।

“সব চাওয়া তো পূরণ হয় না কুদ্দুছ,”—সে ধীরে বললো।

সেদিন কথাটা কুদ্দুছ খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু এখন মনে হয়—সেই কথার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।

দিন গড়িয়ে যেতে লাগলো। ভালোবাসা আরও গভীর হলো, কিন্তু তার সাথে সাথে বাড়তে লাগলো অদৃশ্য এক দূরত্ব। মায়া কখনো কখনো চুপ হয়ে যেত, অনেক কিছু বলতে চেয়েও বলতো না।

এক রাতে কুদ্দুছ জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি কি কিছু লুকাচ্ছো?”

মায়া প্রথমে না করেছিল, কিন্তু তার চোখ সব বলে দিচ্ছিল।

“আমার পরিবার… তারা আমার জন্য একজনকে পছন্দ করেছে,”—অবশেষে সে বলেছিল।

কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠেছিল।
“তুমি কি রাজি?”

মায়া উত্তর দিতে পারেনি। শুধু চুপ করে ছিল।

সেই নীরবতাই ছিল সবচেয়ে বড় উত্তর।

তারপর থেকে সবকিছু বদলে যেতে লাগলো। আগের মতো দেখা হতো না, কথা কমে গেল। কুদ্দুছ বুঝতে পারছিল—মায়া ধীরে ধীরে তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

কিন্তু সে কিছু বলতে পারছিল না। ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে এতটাই অসহায় করে দেয় যে, প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও থাকে না।

একদিন হঠাৎ মায়া তাকে ডেকে বললো,
“চলো, আজ একটু দূরে কোথাও যাই।”

তারা শহরের বাইরে একটা নির্জন জায়গায় গেল। চারপাশে শুধু নীরবতা আর হালকা বাতাসের শব্দ।

মায়া অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললো,
“আমি যদি হঠাৎ করে হারিয়ে যাই, তুমি কি আমাকে খুঁজবে?”

কুদ্দুছ তার দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমি তোমাকে কখনো হারাতে দেবো না।”

মায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।
“সবকিছু আমাদের হাতে থাকে না।”

তার চোখে তখন পানি চিকচিক করছিল।

সেদিন কুদ্দুছ প্রথমবারের মতো ভয় পেয়েছিল। মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে—যা আর কখনো জোড়া লাগবে না।

তারপর এল সেই দিন।

মায়া তাকে জানালো—তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

কুদ্দুছ প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনি। সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। তার চারপাশের পৃথিবী থেমে গেছে, কিন্তু সময় থামেনি।

“তুমি কিছু বলছো না কেন?”—মায়া জিজ্ঞেস করেছিল।

কুদ্দুছ অনেক কষ্টে বলেছিল,
“আমি কী বলবো?”

মায়া কাঁদছিল।
“আমি পারছি না কুদ্দুছ… কিন্তু আমার কোনো উপায় নেই।”

কুদ্দুছ তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেখানে সে দেখেছিল—ভালোবাসা, অসহায়ত্ব, আর ভাঙা স্বপ্নের ছায়া।

সে শুধু বলেছিল,
“তুমি সুখে থাকো।”

মায়া মাথা নাড়ছিল,
“আমি পারবো না…”

কুদ্দুছ মৃদু হেসেছিল,
“তবুও চেষ্টা করো।”

সেদিন তারা শেষবারের মতো একসাথে হাঁটছিল। কোনো কথা ছিল না, শুধু নীরবতা। সেই নীরবতাই যেন তাদের ভালোবাসার শেষ ভাষা হয়ে উঠেছিল।

রাতের শেষে যখন তারা আলাদা হলো, কুদ্দুছ অনুভব করেছিল—তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা হারিয়ে গেছে।

এখন প্রতিদিন রাতে সে সেই স্মৃতিগুলোর সাথে লড়াই করে। মায়ার হাসি, তার কণ্ঠ, তার ছোঁয়া—সবকিছু তাকে তাড়া করে বেড়ায়।

কুদ্দুছ জানে, এই গল্পের শেষ এখনও আসেনি।
কিন্তু সে এটাও জানে—এই গল্পের শেষটা সুখের হবে না।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

কাকে বলবে সে ভালো নেই?
কোথায় রাখবে এই ভারী নিঃশ্বাসগুলো?

অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে সে শুধু একটা কথাই ভাবছে—
মায়া কি কখনো ফিরে আসবে?

নাকি এই ভালোবাসা চিরদিনের মতো অপূর্ণই থেকে যাবে…

চলবে —