ঢাকা, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:৪৬:৩২ PM

উপন্যাস:পত্র দিও

মান্নান মারুফ
25-03-2026 03:08:38 PM
উপন্যাস:পত্র দিও

পর্ব – ৭

আর না হলে একবার .... , আমার স্মৃতি মনে করে যত্ন নিও। হয়তো সবই ভুলেই যেও, আপত্তি নেই। তবুও তুমি কেমন আছো—একটি বার হলেও জানাইও। আমার ভালোবাসা সত্যি হবে তাহলে।
আমি না হয় ভালোবাসতেই ভুল করেছি—ভুল করেছি, নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে। তবুও আমাকে ছাড়া তুমি কি ভালো আছো—জানাইও। পত্র দিও।

চিঠির এই কথাগুলো লিখে কুদ্দুছ অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। যেন শব্দগুলো তার নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে। ভালোবাসা—যেটাকে সে এতদিন আশ্রয় ভেবেছিল, আজ সেটাই যেন তার কাছে এক অদৃশ্য অপরাধ।

তার মনে হলো—সে কি সত্যিই ভুল করেছিল?

ভালোবাসা কি কখনো ভুল হতে পারে?

কুদ্দুছ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে আকাশটা মেঘলা। হালকা বাতাস বইছে। দূরের গাছগুলো দুলছে—ঠিক যেমন দুলত সেই দিনগুলোতে, যখন নেহা তার পাশে ছিল।

সে চোখ বন্ধ করল।

স্মৃতিগুলো একে একে ফিরে আসতে লাগল।

নেহার হাসি, তার চুপচাপ থাকা, হঠাৎ রাগ করা, আবার নিজেই মান ভাঙানো—সবকিছু যেন একসাথে জেগে উঠল।

কুদ্দুছ ধীরে ফিসফিস করে বলল—
“আমি কি সত্যিই তোমাকে ভুলভাবে ভালোবেসেছিলাম, নেহা?”

কোনো উত্তর নেই।

শুধু বাতাস।

সে আবার টেবিলে ফিরে এসে চিঠিটা হাতে নিল।

লিখতে শুরু করল—

“নেহা,
আজ অনেকদিন পর মনে হলো—আমি হয়তো তোমাকে ভালোবেসে ভুল করিনি,
কিন্তু সময়কে বিশ্বাস করে ভুল করেছি।

আমি ভেবেছিলাম—সময় আমাদের জন্য থেমে থাকবে।
কিন্তু সময় তো কারো জন্য থামে না, তাই না?”

কুদ্দুছ থামল।

তার চোখে জল চলে এসেছে।

সে আবার লিখল—

“তুমি যদি সব ভুলে গিয়ে থাকো, তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই।
কারণ, মনে রাখা যেমন কষ্টের, ভুলে যাওয়াও ততটাই কঠিন।

আমি শুধু জানতে চাই—
তুমি কি ভালো আছো?”

এই প্রশ্নটাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সে জানে—এই প্রশ্নের উত্তরেই তার ভালোবাসার সত্যতা লুকিয়ে আছে।

কুদ্দুছের মনে পড়ে গেল—একদিন নেহা বলেছিল,
—“ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া না, ভালো থাকা।”

তখন সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।

আজ বুঝতে পারছে—নেহা কতটা ঠিক ছিল।

যদি নেহা ভালো থাকে—তাহলেই কি তার ভালোবাসা সত্যি?

তাহলে কি তাকে ছেড়ে দেওয়াটাই ছিল সঠিক?

এই প্রশ্নগুলো কুদ্দুছকে প্রতিদিন তাড়া করে।

হঠাৎ তার ফোনটা কেঁপে উঠল।

নেহার মেসেজ।

“আজ খুব অদ্ভুত লাগছে…”

কুদ্দুছ দ্রুত লিখল—
“কি হয়েছে?”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
“মনে হচ্ছে… আমি কিছু হারিয়ে ফেলেছি…”

কুদ্দুছের বুকটা কেঁপে উঠল।

সে লিখল—
“কি হারিয়েছো?”

নেহা অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিল না।

তারপর লিখল—
“জানি না… হয়তো নিজেকেই…”

এই কথাটা পড়ার পর কুদ্দুছের মনে হলো—নেহা শুধু তাকে নয়, নিজেকেও হারিয়েছে।

সে ধীরে লিখল—
“তুমি কি ভালো নেই?”

নেহার উত্তর এল—
“ভালো থাকার চেষ্টা করি…”

এই একই উত্তর—যেটা সে আগে শুনেছে।

এই একই অস্পষ্টতা, একই লুকানো কষ্ট।

কুদ্দুছ বুঝতে পারল—নেহা সুখে নেই।

কিন্তু সে কিছু করতে পারবে না।

এই অসহায়ত্বটাই তার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা।

সে লিখল—
“নেহা, যদি কোনোদিন মনে হয়—তুমি একা,
তাহলে আমার কথা মনে করো।
আমি হয়তো পাশে থাকতে পারব না,
কিন্তু তোমার জন্য থাকব।”

নেহা উত্তর দিল—
“তুমি সবসময় এমন কেন?”

কুদ্দুছ একটু থেমে লিখল—
“কেমন?”

—“নিজের কথা ভাবো না…”

কুদ্দুছ হালকা হেসে ফেলল।

তারপর লিখল—
“হয়তো এটাই আমার ভুল…”

নেহা লিখল—
“না… এটা তোমার সৌন্দর্য…”

এই কথাটা কুদ্দুছের হৃদয়ে নরম করে আঘাত করল।

সে বুঝতে পারল—নেহা এখনো তাকে বোঝে।

তবুও তারা একসাথে নয়।

এই বাস্তবতাটা আরও বেশি কষ্ট দেয়।

কুদ্দুছ আবার চিঠির দিকে ফিরে এল।

শেষ অংশটা লিখতে শুরু করল—

“নেহা,
আমি জানি না—আমার ভালোবাসা তোমার কাছে কি ছিল।
হয়তো একটা ভুল,
হয়তো একটা স্মৃতি,
হয়তো কিছুই না।

কিন্তু আমার কাছে—
তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সত্যি অনুভূতি।

আমি ভুল করেও যদি তোমাকে ভালোবেসে থাকি,
তাহলেও সেই ভুলটাকে আমি ভুলতে চাই না।

কারণ, এই ভুলটাই আমাকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে।”

কুদ্দুছ থামল।

তার মনে হলো—এই কথাগুলোই তার জীবনের সারাংশ।

সে আবার লিখল—

“তুমি যদি সত্যিই ভালো থাকো,
তাহলে আমাকে জানিও।

আমি খুশি হবো—সত্যি বলছি।

আর যদি ভালো না থাকো,
তাহলেও জানিও।

আমি কিছু করতে পারব না,
তবুও পাশে আছি—এই বিশ্বাসটা হয়তো তোমাকে একটু শক্তি দেবে।”

শেষে সে লিখল—

“তুমি ভালো থেকো।
আর যদি পারো—একবার হলেও লিখো।

তোমার একটি চিঠি—
আমার পুরো জীবনের সমান হয়ে যায়।

পত্র দিও…”

চিঠিটা শেষ করে কুদ্দুছ ধীরে চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো—আজ সে নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে।

আর কিছু বলার নেই।

বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

হালকা, নরম বৃষ্টি।

কুদ্দুছ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কাঁচে পড়ছে—ঠিক যেমন তার মনে জমে থাকা কষ্টগুলো ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।

সে মনে মনে বলল—
“নেহা… তুমি ভালো থেকো…”

তার কণ্ঠে ছিল না কোনো দাবি, না কোনো অভিযোগ—শুধু এক নিঃশর্ত ভালোবাসা।

আর সেই ভালোবাসার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর ট্র্যাজেডি—

যেখানে দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবেসেও একসাথে হতে পারেনি।

তবুও তারা ভালোবাসে।

নীরবে।

অপেক্ষায়।

একটি চিঠির জন্য।

(চলবে…)