পর্ব – ১
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কথাই আজ যেন স্মৃতি। শুধু কষ্ট দেয়। কুদ্দুছ ভাবে—কোথায় তার নেহা। সময় আসলে বড় নিষ্ঠুর। সে কখনও কাউকে অপেক্ষা করতে শেখায় না, বরং কে কাকে ফেলে সামনে এগিয়ে যাবে, সেই নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়। তবুও কিছু মানুষ থাকে, যারা সময়ের সাথে পাল্লা দিতে পারে না—তারা থেমে থাকে কোনো এক পুরনো বিকেলের ছায়ায়, কোনো এক স্মৃতির অন্ধকারে। কুদ্দুছ তেমনই একজন।
একটা ছোট্ট শহরের মফস্বল স্কুল থেকে শুরু হয়েছিল তাদের গল্প। কুদ্দুছ তখন ক্লাস নাইন, আর নেহা নতুন ভর্তি হয়েছিল তাদের স্কুলে। প্রথম দিনেই ক্লাসরুমে ঢোকার সময় নেহার চোখে যে ভয়ার্ত লাজুক দৃষ্টি ছিল, সেটাই কুদ্দুছের বুকের কোথাও গেঁথে গিয়েছিল। সেই দৃষ্টির গভীরতায় ছিল অজানা আকর্ষণ, আর ছিল অচেনা এক মায়া।
নেহা ছিল অন্যরকম। খুব বেশি কথা বলত না, কিন্তু যখন বলত, মনে হতো শব্দগুলো যেন আলাদা করে বেঁচে থাকে। কুদ্দুছ কখন যে তার পাশে বসার অজুহাত খুঁজতে শুরু করল, তা সে নিজেও জানে না। কখনো বই ধার চাওয়া, কখনো ক্লাসের নোট—সবই ছিল তার কাছে যাওয়ার অজুহাত।
একদিন বিকেলে স্কুল ছুটির পর মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে কুদ্দুছ বলেছিল,
—“তুমি খুব চুপচাপ থাকো কেন?”
নেহা একটু হেসে বলেছিল,
—“সব কথা কি সবার সাথে বলা যায়?”
সেই হাসির মধ্যেই ছিল এক অদ্ভুত প্রতিশ্রুতি, যা কুদ্দুছকে দিনদিন আরও কাছে টেনে নিয়েছিল।
তারপর কলেজ। একই শহরে, একই কলেজে ভর্তি হলো তারা। সম্পর্কটা তখন আর শুধুই বন্ধুত্ব ছিল না—একটা অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছিল তারা। বিকেলের আড্ডা, লাইব্রেরির নিরবতা, পরীক্ষার আগে রাতজাগা ফোনালাপ—সব মিলিয়ে একটা স্বপ্নের মতো সময়।
ভালবাসা হারিয়ে যায় না। এটা আঠার মত জীবন সঙ্গী হয়ে থাকে। ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে ও কষ্ট দেয়। তবুও মনে হয়—ও যদি কাছে থাকতো! না, ওর সাথে একটু কথা বলতে পারলেও শান্তি পেতাম। এমনকি কারো মারফত খবর পেত—তাতেই কুদ্দুছ যেন খুব খুশি হতো।
কুদ্দুছ কখনো প্রকাশ্যে বলেনি, কিন্তু নেহা বুঝত। নেহার চোখে যখন একটু কষ্ট ভাসত, কুদ্দুছ বুঝে যেত—আজ ওর দিনটা ভালো যায়নি। আর কুদ্দুছের চুপ হয়ে থাকা মানেই নেহার কাছে এক ধরনের উদ্বেগ—“কি হয়েছে তোমার?”
এই না বলা কথাগুলোই ছিল তাদের সবচেয়ে গভীর সংলাপ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যেন সব বদলে গেল।
ঢাকায় ভর্তি হলো কুদ্দুছ, আর নেহা চলে গেল অন্য শহরে। প্রথম প্রথম নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। প্রতিদিন রাতে কথা, মাঝে মাঝে ভিডিও কল, আর দীর্ঘ মেসেজ—যেন দূরত্ব কোনো বাধাই নয়।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কথার সংখ্যা কমতে লাগল। একদিন ফোন না হলে, পরের দিনও না। ব্যস্ততা, ক্লাস, নতুন বন্ধু—সব মিলিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যেতে লাগল তাদের সেই পুরনো ছন্দ।
একদিন গভীর রাতে কুদ্দুছ ফোন করেছিল। অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর নেহা ধরল।
—“হ্যালো…”
—“তুমি এত ব্যস্ত হয়ে গেছো?”
নেহা একটু চুপ থেকে বলেছিল,
—“সবকিছু আগের মতো থাকে না কুদ্দুছ…”
এই কথাটা কুদ্দুছের বুকের ভেতর যেন হঠাৎ করে শূন্যতা তৈরি করেছিল।
তারপর একদিন খবর এল—নেহার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
কুদ্দুছ প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি। সে বারবার ফোন করেছিল, কিন্তু নেহা আর ফোন ধরেনি। মেসেজ পাঠিয়েছিল—“একবার কথা বলো”—কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি।
সেই রাতে কুদ্দুছ বুঝেছিল—কিছু গল্পের শেষটা কখনো লেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
অনেক বছর কেটে গেছে। কুদ্দুছ এখন শহরের এক কোণে ছোট একটা চাকরি করে। মানুষের ভিড়ের মধ্যে থেকেও সে একা। তার ঘরের দেয়ালে এখনো একটা পুরনো ডায়েরি ঝুলে আছে—যেখানে নেহার হাতের লেখা কয়েকটা লাইন।
“কখনো যদি হারিয়ে যাই, খুঁজে নিও না। শুধু মনে রেখো, আমি একসময় তোমার ছিলাম।”
এই লাইনগুলো কুদ্দুছকে প্রতিদিন নতুন করে ভেঙে দেয়।
রাতের পর রাত সে জানালার পাশে বসে থাকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে—নেহা এখন কোথায়? কেমন আছে? সুখে আছে তো?
কুদ্দুছ মাঝে মাঝে নিজের সাথে নিজেই কথা বলে—
“নেহা, তুমি এখন কোথায় আছো? কেমন আছো? পত্র দিও…”
এই “পত্র দিও” কথাটা যেন তার জীবনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হয়ে গেছে।
সে জানে না, নেহা কখনো তার কথা ভাবে কিনা। সে জানে না, কোনো এক রাতে নেহাও কি আকাশের দিকে তাকিয়ে তার কথা মনে করে কিনা। কিন্তু তবুও সে অপেক্ষা করে।
অপেক্ষা—একটা চিঠির।
একদিন বিকেলে হঠাৎ করে কুদ্দুছের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। দরজা খুলে দেখে, পোস্টম্যান দাঁড়িয়ে আছে।
—“আপনার নামে একটা চিঠি এসেছে।”
কুদ্দুছ অবাক হয়ে চিঠিটা হাতে নিল। এই যুগে কেউ চিঠি লেখে?
খামটা হাতে নিয়েই তার বুক কেঁপে উঠল। পরিচিত হাতের লেখা—
“কুদ্দুছের জন্য…”
হাত কাঁপতে লাগল তার। ধীরে ধীরে খামটা খুলল।
ভেতরে একটা ছোট্ট কাগজ।
সে পড়তে শুরু করল—
“কুদ্দুছ,
জানি না এই চিঠি তোমার কাছে পৌঁছাবে কিনা। অনেকদিন ধরে লিখব ভাবছিলাম, কিন্তু সাহস পাইনি।
তুমি কেমন আছো? জানি, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অধিকার হয়তো আমি হারিয়ে ফেলেছি।
জীবন আমাকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে, কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনো দূরে যায় না…
তুমি কি এখনো আমাকে মনে রাখো?”
এতটুকু পড়ে কুদ্দুছের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
চিঠির বাকিটা পড়ার আগেই সে বুঝে গেল—কিছু ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না। শুধু সময়ের কাছে হার মেনে নীরব হয়ে যায়।
কুদ্দুছ চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
তার মনে হলো—আজ এতদিন পর, তার সেই একটাই চাওয়া পূরণ হলো।
নেহা পত্র দিয়েছে।
কিন্তু এই পত্র কি নতুন কোনো শুরুর ইঙ্গিত, নাকি পুরনো ক্ষতকে আরও গভীর করে দেওয়ার জন্যই এসেছে?
কুদ্দুছ জানে না।
সে শুধু জানে—তার অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
(চলবে…)