ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:৩৭:৩১ PM

ছোট গল্প:-আর্তনাদ

মান্নান মারুফ
27-03-2026 12:06:00 PM
ছোট গল্প:-আর্তনাদ
 
 
মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে চিৎকার করে বলি—
“তোমাকে ছাড়া আমার খুব কষ্ট হয়।”
কিন্তু বলা হয় না। শব্দগুলো গলা পর্যন্ত এসে থেমে যায়। বুকের ভেতর একটা ভারী পাথর চেপে বসে থাকি, যেন বললেই সবকিছু ভেঙে যাবে—আমার নিজের ভিত, আমার অহংকার, আমার শেষ আশ্রয়টুকুও।
কারণ আমি জানি, আমার এই আর্তনাদ তোমার কানে পৌঁছালেও তোমার মনে কোনো দাগ কাটবে না। তুমি হয়তো একটু থামবে, হয়তো কিছুক্ষণ নীরব থাকবে, তারপর আবার তোমার নতুন জীবনের দিকে ফিরে যাবে। আর আমি? আমি আটকে থাকব সেই পুরোনো সময়ের ভাঙা দরজার সামনে।
আমি তো তোমার কাছে কেবল একটি উপলক্ষ ছিলাম—একটি সাময়িক আশ্রয়, একটি গল্পের ছোট্ট চরিত্র। অথচ তুমি ছিলে আমার পুরো গল্প। আমার সকাল, আমার বিকেল, আমার সমস্ত রাতের নির্জনতা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু তুমি।
আমাদের গল্পটা খুব সাধারণভাবে শুরু হয়েছিল।
সেই বিকেলের কথা মনে আছে? আকাশে হালকা মেঘ ছিল, বাতাসে কেমন একটা শীতলতা ভাব। তুমি প্রথম আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলে—একটা অচেনা হাসি নিয়ে। তোমার চোখে তখন একরাশ কৌতূহল, আর আমার চোখে লুকানো বিস্ময়।
“আপনি কি এখানে নতুন?”—তোমার সেই প্রথম প্রশ্নটা এখনো কানে বাজে।
আমি হেসে বলেছিলাম, “হ্যাঁ, তবে খুব বেশি দিন থাকব না।”
তুমি তখন বলেছিলে, “কিছু কিছু মানুষ আসে অল্প দিনের জন্য, কিন্তু থেকে যায় অনেকদিন।”
সেদিন বুঝিনি, তুমি নিজের কথাই বলছিলে।
দিনগুলো ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল।
আমাদের কথা বাড়তে লাগল।
প্রথমে আনুষ্ঠানিকতা, তারপর বন্ধুত্ব, তারপর এক অদ্ভুত নির্ভরতা।
তুমি আমার প্রতিটা ছোট ছোট ব্যাপারে খেয়াল রাখতে। আমি কখন খেয়েছি, কখন ঘুমিয়েছি, মন খারাপ কিনা—সবকিছু যেন তুমি বুঝে যেতে।
একদিন হঠাৎ তুমি বলেছিলে,
“তুমি জানো? তোমার হাসিটা খুব অদ্ভুত। এটা দেখে মনে হয় তুমি খুব শক্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব নরম।”
আমি হেসেছিলাম। বলিনি—তোমার জন্যই তো এই নরম হওয়া।
তারপর একদিন বুঝলাম—আমি আর আগের মতো নেই।
তুমি না থাকলে দিনটা ফাঁকা লাগে।
তোমার একটা মেসেজ না এলে বুকের ভেতর অস্থিরতা কাজ করে।
তোমার কণ্ঠস্বর শুনলেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
তখনই বুঝেছিলাম—আমি ভালোবেসে ফেলেছি।
কিন্তু বলা হয়নি।
কারণ ভয় ছিল—যদি বলার পর সবকিছু বদলে যায়?
তুমি মাঝে মাঝে বলতেই—
“আমি খুব সাধারণ একটা মানুষ। আমাকে নিয়ে এত ভাবো না।”
আমি মুচকি হেসে বলতাম, “আমি তো ভাবি না, নিজে থেকেই ভাবনা চলে আসে।”
তুমি জানতেও না—এই কথার ভেতরে কতটা সত্যি লুকানো ছিল।
আমাদের সম্পর্কটা কোনো নাম পায়নি।
বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি, ভালোবাসার চেয়ে কম—এই অদ্ভুত অবস্থানেই আমরা আটকে ছিলাম।
একদিন রাতের বেলা তুমি বলেছিলে,
“জানো, আমি কখনো কারো জীবনে স্থায়ী হতে পারব না।”
আমি বলেছিলাম, “সবাই পারে না, কিন্তু কেউ কেউ পারে।”
তুমি হেসেছিলে।
সেই হাসির ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা ছিল—যেটা আমি তখন বুঝতে পারিনি।
তারপর একদিন তুমি বদলে গেলে।
হঠাৎ করেই তোমার সময় কমে গেল।
কথা কমে গেল।
আগের মতো খোঁজ নেওয়া বন্ধ হয়ে গেল।
আমি ভাবলাম—হয়তো তুমি ব্যস্ত।
নিজেকে বুঝিয়েছিলাম—সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু ঠিক হলো না।
একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম,
“তুমি কি আর আগের মতো নেই?”
তুমি খুব সহজভাবে বললে,
“মানুষ তো বদলায়।”
এই একটুকু কথায় যেন আমার ভেতরের সবকিছু ভেঙে পড়ল।
সেই রাতেই প্রথম বুঝলাম—
অবহেলার চেয়ে বড় কোনো যন্ত্রণা নেই।
রাতের অন্ধকারে যখন বালিশ ভিজে যায় চোখের জলে, তখন বোঝা যায়—কেউ কাছে থেকেও কত দূরে চলে যেতে পারে।
আমি ফোন হাতে নিয়ে অনেকবার তোমাকে লিখতে চেয়েছি—
“ফিরে এসো।”
কিন্তু লিখিনি।
কারণ আমি জানতাম—ফিরে আসার ইচ্ছা যার নেই, তাকে ডেকে আনা যায় না।
কিছুদিন পর জানতে পারলাম—
তুমি খুব ভালো আছো।
নতুন মানুষ, নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন—সবকিছু নিয়ে তুমি ব্যস্ত।
আমি দূর থেকে দেখলাম।
চুপচাপ।
হিংসে হয়নি।
রাগ হয়নি।
শুধু একটা প্রশ্ন মনে জেগেছিল—
“আমি তাহলে কী ছিলাম?”
আজও মাঝে মাঝে সেই পুরোনো ঠিকানায় গিয়ে দাঁড়াই—মনে মনে ভাবি তোমার কথা।
যেখানে আমরা প্রথম কথা বলেছিলাম।
যেখানে তুমি বলেছিলে—“কিছু মানুষ অল্প দিনের জন্য আসে, কিন্তু থেকে যায় অনেকদিন।”
তুমি ঠিকই ছিলে।
তুমি থেকে গেছো—আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে, প্রতিটা একাকী রাতে, প্রতিটা অপূর্ণ বাক্যে।
আমার পৃথিবীটা থেমে গেছে সেই জায়গাতেই।
সময় এগিয়ে গেছে, মানুষ বদলেছে, ঋতু বদলেছে—
কিন্তু আমি এখনো আটকে আছি সেই পুরোনো অনুভূতির ভেতরে।
তুমি হয়তো সুখে আছো—
হাসছো, নতুন করে বাঁচছো।
আর আমি?
আমি শিখে গেছি—
কিছু ভালোবাসা শেষ হয় না,
শুধু মানুষগুলো চলে যায়।
মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে চিৎকার করে বলি—
“তোমাকে ছাড়া আমার খুব কষ্ট হয়।”
কিন্তু এখন আর বলার প্রয়োজন হয় না।
কারণ আমি জেনে গেছি—
যে শুনতে চায় না, তার জন্য কোনো শব্দই যথেষ্ট নয়।
তবুও একটা সত্যি রয়ে গেছে—
আমি যদি আবার শুরু করতে পারতাম,
তাহলেও তোমাকেই ভালোবাসতাম।
কারণ তুমি আমাকে শিখিয়েছো—
ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়,
কখনো কখনো চুপচাপ হারিয়ে যাওয়াও ভালোবাসা।
শেষ পর্যন্ত, আমি এখনো সেই মানুষ—
যে পুরোনো ঠিকানায় দাঁড়িয়ে থাকি,
কারো ফিরে আসার অপেক্ষায় নয়,
বরং নিজের ভেতরের একটা গল্পকে শেষ করার জন্য।
কিন্তু সেই গল্পটা আজও শেষ হয়নি।
কারণ—
তুমিই ছিলে আমার পুরো একটা গল্প।
সমাপ্ত ।