ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৩:৫০:২৪ PM

উপন্যাস: গুডবয়

মান্নান মারুফ
26-03-2026 01:25:28 PM
উপন্যাস: গুডবয়

পর্ব–২
রিচি যে তারই সহকর্মী জানতো না কুদ্দুছ। এই অফিসে জয়েন করেছে মাস ছয়েক হলো। মেয়েটা খুব চুপচাপ স্বভাবের, কারও সাথে তেমন মিশত না, নিজের ডেস্কে বসে শুধু কাজ করে যেত। অফিসের অন্য কলিগদের ফিসফাস থেকে কুদ্দুছ জানতে পারে, রিচি একজন ডিভোর্সি। মাত্র কয়েকদিনের মাথায় শেষ হয় তার সংসার পর্ব। এক বছর আগে অত্যাচারী স্বামীর নরক থেকে সে নিজের প্রাণটা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু এই সমাজের একটা নোংরা স্বভাব হলো—একজন ডিভোর্সি মেয়েকে দেখলেই মনে করে তার চরিত্রে কোনো দোষ আছে।

অফিসের অনেকেই রিচিকে নিয়ে আড়ালে-আবডালে নোংরা কথাবার্তা বলত। কিন্তু কুদ্দুছ ছিল বিপরীত। সে মনে করত, রিচি একটা আহত পাখির মতো—যার ডানায় কেউ নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করেছে, যার বুকের গভীরে এমন ক্ষত আছে যার ব্যথা হয়তো কোনোদিনই পুরোপুরি সারবে না।

কুদ্দুছ প্রথম যেদিন এই কথাগুলো শুনেছিল, সেদিন তার ভেতরে এক অদ্ভুত ক্ষোভ জন্ম নিয়েছিল। মানুষের এই সহজ বিচার, এই নির্মমতা তাকে নাড়া দিয়েছিল গভীরভাবে। সে বুঝতে পারছিল—এই মেয়েটা শুধু একা নয়, সে জীবনের সাথে লড়াই করছে প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে।

সেদিন বিকেলে অফিসে ঢুকে সে রিচির ডেস্কের দিকে তাকাল। মাথা নিচু করে কাজ করছে। চারপাশে কত গুঞ্জন, কত অবজ্ঞা—কিন্তু যেন কিছুই শুনছে না সে। অথবা শুনেও শুনছে না।

কুদ্দুছের মনে হলো—এই নীরবতা কোনো দুর্বলতা নয়, এটা এক ধরনের শক্তি।

কিছুদিন ধরে কুদ্দুছ লক্ষ্য করছিল—রিচি কখনও নিজের কথা বলে না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে ছোট করে উত্তর দেয়, তারপর আবার নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়। যেন নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছে।

কুদ্দুছ সেই দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়াতে চায়—ভাঙতে নয়, শুধু পাশে দাঁড়াতে।

একদিন দুপুরে অফিস ক্যান্টিনে হঠাৎ রিচির সাথে তার মুখোমুখি দেখা। সাধারণত রিচি একা বসে খায়, কিন্তু সেদিন জায়গা না থাকায় কুদ্দুছের টেবিলেই বসতে হলো।

একটু অস্বস্তিকর নীরবতা।

কুদ্দুছ নিজেই বলল, “আপনি এখানে নতুন না, তাই না?”

রিচি তাকাল, হালকা হাসল, “ছয় মাস হয়ে গেল।”

“ও… আমি খেয়াল করিনি।”

“আপনি খেয়াল করার মতো মানুষ নন মনে হয়,”—রিচির কণ্ঠে হালকা খোঁচা, কিন্তু তাতে বিদ্বেষ নেই।

কুদ্দুছ একটু হেসে বলল, “হয়তো… তবে এখন খেয়াল করছি।”

এই ছোট্ট কথোপকথন যেন একটা সূচনা ছিল। খুব বড় কিছু না, কিন্তু নিঃশব্দে একটা দূরত্ব কমে গেল।

এরপর থেকে মাঝে মাঝে কথা হতো। খুব সাধারণ কথা—কাজ, অফিস, বই, শহরের যানজট… কিন্তু সেই সাধারণ কথার ভেতরেই এক ধরনের স্বস্তি ছিল।

তবে অফিসের পরিবেশটা কখনও স্বাভাবিক ছিল না।

একদিন কুদ্দুছ শুনল—দুইজন সহকর্মী রিচিকে নিয়ে হাসাহাসি করছে।

“এই মেয়েটা বেশি ভদ্র সাজে… আসলে কেমন কে জানে!”

“ডিভোর্সি তো… কিছু তো ছিলই।”

কুদ্দুছের ভেতরটা হঠাৎ করে গরম হয়ে উঠল।

সে এগিয়ে গিয়ে বলল, “কাউকে নিয়ে এমন কথা বলা ঠিক না।”

দুজনেই একটু থমকে গেল।

“তুমি তো ওর উকিল হয়ে গেছো দেখি!”

কুদ্দুছ শান্ত গলায় বলল, “না, আমি শুধু মানুষ হয়ে কথা বলছি।”

সেদিনের পর থেকে অফিসে একটা অদৃশ্য পরিবর্তন এলো। কেউ আর সরাসরি কিছু বলত না, কিন্তু কুদ্দুছ বুঝতে পারত—সে আলাদা হয়ে গেছে।

তবুও সে পিছিয়ে আসেনি।

কারণ তার কাছে এটা শুধু রিচির জন্য না—এটা নিজের বিবেকের জন্য।

একদিন সন্ধ্যায় অফিস ছুটির পর, রিচি নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা।

কুদ্দুছ এগিয়ে গেল।

“কোথাও যাবেন?”

রিচি একটু চুপ করে থেকে বলল, “হাঁটতে ইচ্ছে করছে… যাবেন?”

তারা দুজন ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। শহরের ভিড়ের মাঝেও যেন একটা নির্জনতা তৈরি হয়েছিল তাদের চারপাশে।

হঠাৎ রিচি বলল, “আপনি সেদিন কেন ওদের কিছু বললেন?”

“কারণ ওরা ভুল বলছিল।”

“আপনি জানেন না আমি কেমন…”

“জানার দরকার নেই,”—কুদ্দুছ থামিয়ে দিল, “আমি যা দেখছি, তাতেই বিশ্বাস করি।”

রিচি থেমে গেল। তার চোখে এক অদ্ভুত দৃষ্টি।

“মানুষ এত সহজে বিশ্বাস করে না,”—সে ধীরে বলল।

“আমি করি,”—কুদ্দুছ বলল।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর রিচি ধীরে ধীরে বলল, “সবাই ভাবে আমার দোষ ছিল… কিন্তু কেউ জানতে চায় না আমি কি সহ্য করেছি।”

কুদ্দুছ কিছু বলল না। শুধু পাশে হাঁটতে থাকল।

“বিয়ের পর প্রথম কয়েকদিন সব ঠিক ছিল,”—রিচি বলতে শুরু করল, “তারপর… ধীরে ধীরে বদলে গেল সবকিছু। কথা থেকে অপমান, অপমান থেকে মারধর… একসময় মনে হতো আমি মানুষ না, একটা বস্তু।”

তার কণ্ঠ কাঁপছিল।

“আমি চেয়েছিলাম সংসারটা টিকুক… কিন্তু একসময় বুঝলাম—বাঁচতে হলে বেরিয়ে আসতে হবে।”

কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল।

“আপনি খুব সাহসী,”—সে ধীরে বলল।

রিচি হালকা হাসল, “সাহসী না… বাঁচতে চেয়েছিলাম শুধু।”

সেদিনের পর কুদ্দুছের কাছে রিচি আর শুধু একজন সহকর্মী রইল না।

সে হয়ে উঠল এক বাস্তব গল্প—যন্ত্রণা, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার এক নিঃশব্দ প্রতীক।

দিনগুলো এগোতে লাগল।

কুদ্দুছ এখন রিচির সাথে কথা না বললে দিনটাই অসম্পূর্ণ মনে হয়। আর রিচিও যেন একটু একটু করে খুলে যাচ্ছে।

একদিন বৃষ্টির দিনে, তারা আবার সেই পুরনো চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে।

রিচি বলল, “আপনি কি জানেন… আমি আবার হাসতে শিখেছি।”

“কেন? আগে হাসতেন না?”

“না… ভুলে গিয়েছিলাম।”

“এখন কেন মনে পড়ল?”

রিচি তাকাল কুদ্দুছের দিকে।

“কারণ… কেউ আমাকে বিচার না করেই যা শুনেছে তাই বিশ্বাস করছে।”

কুদ্দুছ কিছু বলল না। কিন্তু তার ভেতরে যেন এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল।

সে বুঝতে পারছিল—এটা আর শুধু সহানুভূতি না।

এটা আরও গভীর কিছু।

কিন্তু সেই অনুভূতির সাথে সাথে একটা ভয়ও ছিল।

সমাজ… পরিবার… বাস্তবতা…

সে কি পারবে এই পথটা ধরে রাখতে?

একদিন রাতে বাড়ি ফিরে মা বললেন, “তোর জন্য একটা মেয়ে দেখছি…”

কুদ্দুছ চুপ করে রইল।

তার মনে শুধু একটা মুখ—রিচি।

একটা প্রশ্ন তাকে তাড়া করতে লাগল—
সে কি সমাজের নিয়ম মেনে চলবে, নাকি নিজের হৃদয়ের?

আর রিচি?
সে কি আবার বিশ্বাস করতে পারবে ভালোবাসাকে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা।

কিন্তু একটা সত্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে—
ভালোবাসা কখনও সহজ হয় না।
বিশেষ করে যখন সেটা সমাজের চোখে “স্বাভাবিক” না হয়।

তবুও…

হয়তো এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা—
যেখানে কেউ কারও অতীত দেখে না, শুধু বর্তমানটাকে অনুভব করে।


বরং এখনই শুরু হচ্ছে সেই পথ—
যেখানে ভালোবাসা আর বাস্তবতা মুখোমুখি দাঁড়াবে।

চলবে…