ঢাকা, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬,
সময়: ১০:৩২:৩৬ PM

উপন্যাস: শেষ নিঃশ্বাস

মান্নান মারুফ
29-03-2026 08:53:41 PM
উপন্যাস: শেষ নিঃশ্বাস

পর্ব–৪

ভীষণ অবসন্ন। কে শুনবে কষ্টের কথা? এমন মানুষটার বড় অভাব। হৃদয়ের গভীরে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ মরুভূমি কষ্টটা জ্বালায়, বুকটা পুড়িয়ে দেয়।

রাত গভীর হয়েছে। শহরের আলো নিভে আসছে ধীরে ধীরে। কিন্তু কুদ্দুছের চোখে ঘুম নেই। বিছানায় শুয়ে সে শুধু ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, এই ছাদের ওপারেই কোথাও তার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো লুকিয়ে আছে।

ভীষণ অবসন্ন সে। শুধু শরীর নয়—মনও ক্লান্ত, অনুভূতিগুলো ক্লান্ত, ভালোবাসাটাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

কে শুনবে তার কষ্টের কথা?

এই প্রশ্নটা তাকে প্রতিদিন তাড়া করে। মানুষে ভরা এই পৃথিবীতে এমন একজন মানুষও নেই, যার কাছে সে নির্ভয়ে বলতে পারে—“আমি ভালো নেই।”

মায়া ছিল সেই মানুষটা।

যার সামনে সে নিজের সব দুর্বলতা খুলে বলতে পারতো, যার কাঁধে মাথা রাখলে পৃথিবীর সব কষ্ট হালকা মনে হতো।

আজ সেই মানুষটাই নেই।

এই অভাবটা শুধু শূন্যতা নয়—এটা যেন এক অন্তহীন মরুভূমি। হৃদয়ের গভীরে গড়ে ওঠা সেই বিস্তীর্ণ মরুভূমি প্রতিদিন তাকে পুড়িয়ে দেয়।

কুদ্দুছ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

বাইরে হালকা বাতাস বইছে। দূরের কোনো গাছের পাতার শব্দ ভেসে আসছে। এই নীরবতার মধ্যেও সে যেন নিজের ভেতরের আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছে।

হঠাৎ তার মনে হলো—সে আর পারছে না।

এইভাবে বাঁচা কি বাঁচা?

প্রতিটি দিন একইরকম, প্রতিটি রাত একইরকম—শুধু কষ্টের রঙ বদলায়।

সে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ডায়েরিটা খুললো।

পাতাগুলো ভরা তার নিজের লেখা কষ্টের গল্পে।

সে আবার লিখতে শুরু করলো—

“আজ খুব ক্লান্ত আমি।

এই ভালোবাসা আমাকে বাঁচায়নি—বরং ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছে।

আমি কাউকে দোষ দিই না। না মায়াকে, না নিজেকে। তবুও কেন এত কষ্ট হয়?

মনে হয়, আমার ভেতরটা একটা মরুভূমি হয়ে গেছে। যেখানে কোনো ফুল ফোটে না, কোনো বৃষ্টি নামে না।

শুধু জ্বালা… আর জ্বালা…”

কলমটা থেমে গেল।

কুদ্দুছ চোখ বন্ধ করলো।

হঠাৎ তার মনে হলো—মায়া যেন খুব কাছে।

“তুমি কেন এভাবে কষ্ট পাচ্ছো?”—মায়ার কণ্ঠ যেন ভেসে এলো।

কুদ্দুছ চোখ খুললো। চারপাশে কেউ নেই।

তবুও সে উত্তর দিল—
“কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি…”

নীরবতা।

কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও যেন একটা উত্তর লুকিয়ে আছে—একটা অসমাপ্ত কথোপকথন।

পরদিন সকালে কুদ্দুছ অফিসে গেল। অনেকদিন পর নিজেকে একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো।

সহকর্মীরা অবাক হলো তাকে দেখে।

“তুই তো অনেকদিন পরে এলি!”—একজন বললো।

কুদ্দুছ মৃদু হাসলো।
“হ্যাঁ… একটু ব্যস্ত ছিলাম।”

কিন্তু সে জানে—এই ব্যস্ততা আসলে নিজেকে ভুলে থাকার চেষ্টা।

দুপুরে হঠাৎ বৃষ্টি নামলো।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কুদ্দুছ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলো।

এই বৃষ্টি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই প্রথম দিনের স্মৃতিতে—যেদিন সে মায়াকে দেখেছিল।

তার ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটে উঠলো।

কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই ছিল গভীর কষ্ট।

হঠাৎ সে একটা সিদ্ধান্ত নিল।

সে আবার সেই জায়গাগুলোতে যাবে—যেখানে তার আর মায়ার স্মৃতি লুকিয়ে আছে।

হয়তো সেই স্মৃতিগুলোর মধ্যেই সে খুঁজে পাবে কিছু উত্তর।

সন্ধ্যায় সে বের হলো।

প্রথমে গেল সেই চায়ের দোকানে। তারপর সেই রাস্তা, সেই পার্ক, সেই নদীর ধারে।

প্রতিটি জায়গাতেই সে যেন মায়ার উপস্থিতি অনুভব করলো।

মনে হচ্ছিল, মায়া তার পাশেই আছে—হেসে কথা বলছে, তার দিকে তাকিয়ে আছে।

কুদ্দুছ বুঝতে পারলো—মায়া শুধু তার জীবনের একটা অংশ নয়, সে তার পুরো অস্তিত্বে মিশে গেছে।

তাকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।

রাত গভীর হয়ে এলো।

নদীর ধারে বসে কুদ্দুছ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

হঠাৎ তার বুকটা আবার কেঁপে উঠলো।

শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

সে হাত দিয়ে বুক চেপে ধরলো।

মনে হচ্ছে, এইবার আর বাঁচা হবে না।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার—তার ভয় লাগছে না।

বরং একটা শান্তি অনুভব করছে।

মনে হচ্ছে, সে ধীরে ধীরে সেই জায়গার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—যেখানে কোনো কষ্ট নেই, কোনো অভাব নেই।

তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো মায়ার মুখ।

“তুমি এসেছো?”—সে ফিসফিস করে বললো।

মায়া হাসলো।

“আমি তো সবসময়ই তোমার সাথে ছিলাম।”

কুদ্দুছের চোখ ভিজে উঠলো।

“আমি খুব ক্লান্ত মায়া…”

“জানি…”

“আমি আর পারছি না…”

মায়া তার হাতটা ধরলো।

“আর কষ্ট পেতে হবে না…”

কুদ্দুছ চোখ বন্ধ করলো।

তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে।

মনে হচ্ছে, সেই বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে অবশেষে বৃষ্টি নামছে।

কষ্টগুলো ধুয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু…

হঠাৎই সে আবার চোখ খুললো।

চারপাশে অন্ধকার, নদীর শব্দ, আর একা সে।

মায়া নেই।

সবকিছুই ছিল তার কল্পনা।

সে এখনও বেঁচে আছে।

কিন্তু এই বেঁচে থাকাটাই এখন তার সবচেয়ে বড় কষ্ট।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।

আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।

এই নিঃশ্বাসে আছে তার সব ক্লান্তি, সব ভালোবাসা, সব না বলা কথা।

সে জানে—তার গল্প এখনও শেষ হয়নি।

কিন্তু সেই শেষটা খুব কাছে।

আর সেই শেষেই হয়তো সে খুঁজে পাবে মুক্তি।

হয়তো সেখানে মায়া অপেক্ষা করছে…

চলবে —