বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে কিছু ঘটনা যুগান্তকারী মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৫৬ সালের Suez Crisis ছিল তেমনই একটি ঘটনা, যা শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়, বরং একটি সাম্রাজ্যের অবসানের সূচনা এবং আরেকটি শক্তির উত্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে। আজ ২০২৬ সালে এসে অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন—ইতিহাস কি আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে? Strait of Hormuz ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেই একই পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যা সুয়েজ সংকট ব্রিটিশদের জন্য এনেছিল?
১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট Gamal Abdel Nasser সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দিলে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরায়েল যৌথভাবে সামরিক অভিযান চালায়। সামরিকভাবে তারা কিছু সাফল্য পেলেও রাজনৈতিকভাবে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে United States এবং Soviet Union—এই দুই পরাশক্তির চাপের মুখে ব্রিটেনকে পিছু হটতে বাধ্য হতে হয়। এই ঘটনাই বিশ্ব রাজনীতিতে ব্রিটিশ একক আধিপত্যের পতন ঘটায় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা অনেকটাই সেই সময়ের সঙ্গে তুলনীয়। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এটি শুধু একটি আঞ্চলিক পথ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রাণরস। Iran দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রণালির ওপর তার কৌশলগত প্রভাব বজায় রেখেছে এবং বিভিন্ন সময়ে এটি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে।
যদি ইরান বাস্তবিক অর্থেই হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা আনতে পারে। তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির মতো সমস্যাগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র এখন এক জটিল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে দেশটির জাতীয় ঋণ প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই বিশাল ঋণের বোঝা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতিহাস বলছে, যখন কোনো রাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় তার অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সেই শক্তির পতনের সূচনা ঘটে।
সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও বর্তমান ইরান ১৯৫৬ সালের মিশরের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। ইরানের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলেও দ্রুত ও নিশ্চিত জয় পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র Israel-এর নিরাপত্তাও এই পরিস্থিতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েলের সামরিক শক্তি অনেকাংশে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে যদি হরমুজ সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। ১৯৫৬ সালে বিশ্ব ছিল দ্বিধাবিভক্ত—একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু আজকের বিশ্ব বহুমাত্রিক। China, Russiaসহ আরও কয়েকটি শক্তি বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে কোনো একক ঘটনার মাধ্যমে দ্রুত ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা আগের তুলনায় কম।
তবুও ইতিহাসের শিক্ষা উপেক্ষা করা যায় না। Suez Canal যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অহংকার ভেঙে দিয়েছিল, তেমনি হরমুজ প্রণালিও একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করতে পারে। এটি হয়তো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পতন ঘটাবে না, কিন্তু তার একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ইতিহাস পুরোপুরি নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে না, তবে এর ধরণ ও প্রবণতা বারবার ফিরে আসে। ১৯৫৬ সালের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের শিখিয়েছে যে সামরিক শক্তি একা কোনো রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে না—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং বৈশ্বিক সমর্থন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের হরমুজ সংকট সেই শিক্ষাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্ব এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যুক্তরাষ্ট্র কি তার কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, নাকি নতুন কোনো শক্তি সেই জায়গা দখল করবে—তার উত্তর নির্ভর করছে বর্তমান সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ কৌশলের ওপর। ইতিহাসের চাকা ঘুরছে, কিন্তু সেটি ঠিক কোন দিকে যাবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।