পর্ব – ১
আমি তোমাকে শুধু ভালোবাসি না—আমি তোমাকে ধারণ করি।
এই কথাটা প্রথম কবে নিজের কাছে স্বীকার করেছিলাম, ঠিক মনে নেই। হয়তো সেই বিকেলটা, যখন শেষবার তোমার হাতটা ছুঁয়ে ছিলাম, কিংবা সেই রাতটা, যখন তোমার নামটা নিঃশব্দে উচ্চারণ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আজ বুঝি—ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, এটা এক ধরনের বাসস্থান। আর সেই বাসস্থানের প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা জানালা, প্রতিটা শিরায়-উপশিরায় তুমি।
আমার শরীরের প্রতিটা শিরায় যখন রক্ত বইতে থাকে, আমি অনুভব করি—সেখানে নিপার নাম মিশে আছে।
মানুষ বলে, এটা অসুস্থতা।
হয়তো তাই।
কিন্তু আমি বলি—তুমি আমার সেই ঔষধ, যা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। আবার সেই বিষ, যা আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়।
নিপার সঙ্গে আমার পরিচয়টা খুব সাধারণ ছিল। এমন কিছু না, যেটা গল্পে লেখা যায়। কলেজের করিডোরে হঠাৎ দেখা, একটা ভুল করে রাখা বই, আর একটা ছোট্ট “ধন্যবাদ”—এই দিয়েই শুরু।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, সেই সাধারণ ঘটনাগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ স্মৃতিতে পরিণত হলো।
নিপা খুব বেশি কথা বলত না। ওর চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি ছিল, আবার একই সঙ্গে একটা গভীর দূরত্বও। যেন ও সবসময় একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে—সবাই থেকে, সবকিছু থেকে।
প্রথম দিকে আমি ওকে বুঝতে পারতাম না। শুধু দূর থেকে দেখতাম।
ক্লাসে বসে, লাইব্রেরির কোণায়, কিংবা মাঠের পাশে গাছের নিচে—নিপা সব জায়গায় একা।
একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “তুমি সবসময় একা থাকো কেন?”
ও একটু হেসেছিল। সেই হাসিটা ছিল খুব মৃদু, খুব সংযত।
— “সবাই একা না? শুধু কেউ কেউ সেটা লুকিয়ে রাখে।”
সেদিনই প্রথম বুঝলাম—নিপা অন্যরকম।
আমাদের বন্ধুত্বটা খুব ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল। কোনো নাটকীয়তা ছিল না, কোনো বড় বড় কথা ছিল না। ছোট ছোট মুহূর্ত, ছোট ছোট আলাপ—এইগুলোই আমাদের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল।
আমি ওকে গল্প শোনাতাম—আমার, আমার গ্রামের, আমার ছোটবেলার। আর নিপা শুনত।
ও খুব কম কথা বলত, কিন্তু যখন বলত—তখন মনে হতো, প্রতিটা শব্দের ভেতরে একটা গভীরতা আছে।
একদিন ও বলেছিল,
— “তুমি খুব সহজভাবে কথা বলো।”
আমি হেসে বলেছিলাম,
— “সহজ না হলে কি কঠিন করে বলব?”
ও আবার সেই মৃদু হাসিটা দিয়েছিল।
— “না… কিন্তু সবাই তো এমন না।”
সেদিন কেন জানি মনে হয়েছিল—ও আমার ভেতরে কিছু একটা খুঁজে পেয়েছে। আর আমি… আমি তো অনেক আগেই ওর ভেতরে হারিয়ে গিয়েছিলাম।
সময়টা কেমন দ্রুত বদলে গেল, টের পাইনি।
আমাদের প্রতিদিন দেখা হতো। কখনো ক্লাস শেষে, কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো কোনো কারণ ছাড়াই।
নিপা আমার জীবনের একটা অভ্যাস হয়ে উঠেছিল।
সকালে উঠেই মনে হতো—আজ ওকে দেখব। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে হতো—আজ ওর সঙ্গে কথা হয়েছে।
এই ছোট ছোট অনুভূতিগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু আমি কখনো ওকে বলিনি—আমি ওকে ভালোবাসি।
কেন বলিনি?
হয়তো ভয় ছিল।
ভয়—যদি ও দূরে সরে যায়।
ভয়—যদি এই সম্পর্কটা ভেঙে যায়।
ভয়—যদি ও বলে, “আমি তোমাকে এভাবে দেখি না।”
তাই চুপ করে ছিলাম।
ভেবেছিলাম—এইভাবেই থাকুক। ও থাকুক আমার পাশে, আমার জীবনের অংশ হয়ে। নামটা না থাকলেও, অনুভূতিটা তো আছে।
একদিন বিকেলে আমরা কলেজের পেছনের সেই পুরোনো গাছটার নিচে বসেছিলাম।
হালকা বাতাস বইছিল। চারপাশে একটা অদ্ভুত শান্তি।
নিপা হঠাৎ বলল,
— “তুমি কখনো কাউকে ভালোবেসেছ?”
প্রশ্নটা শুনে আমি থমকে গিয়েছিলাম।
কত সহজ একটা প্রশ্ন। কিন্তু আমার জন্য কত কঠিন।
আমি একটু হেসে বলেছিলাম,
— “হয়তো।”
নিপা তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।
— “হয়তো মানে?”
আমি চোখ সরিয়ে নিয়েছিলাম।
— “সবকিছু কি বলা যায়?”
ও কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
— “না… সবকিছু বলা যায় না।”
সেদিন মনে হয়েছিল—ও বুঝে গেছে।
কিন্তু ও কিছু বলেনি।
আর আমিও না।
তারপর একদিন সবকিছু বদলে গেল।
সেদিন আকাশটা অদ্ভুতভাবে মেঘলা ছিল। বাতাসে একটা ভারী অনুভূতি।
নিপা আমাকে ডাকল।
আমরা সেই একই জায়গায় বসেছিলাম—গাছটার নিচে।
কিন্তু আজকের নিপা অন্যরকম।
ওর চোখে সেই শান্তি নেই। বরং একটা দ্বিধা, একটা অস্থিরতা।
— “আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই,” ও বলল।
আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
— “বল।”
ও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— “আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
এক মুহূর্তে যেন সব শব্দ থেমে গেল।
আমি কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না।
শুধু ওর ঠোঁট নড়ছিল, আর আমার পৃথিবীটা ভেঙে যাচ্ছিল।
— “ছেলেটা ভালো… পরিবারও ভালো… আমি না বলতে পারিনি…”
ওর কথাগুলো আমার কানে পৌঁছাচ্ছিল, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না।
আমার মাথার ভেতর শুধু একটা শব্দ ঘুরছিল—
“বিয়ে…”
আমি অনেক কষ্টে বললাম,
— “তুমি… খুশি?”
নিপা আমার দিকে তাকাল।
ওর চোখ স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু একটা গভীর ক্লান্তি ছিল।
— “খুশি হওয়াটা সবসময় নিজের হাতে থাকে না।”
সেদিন বুঝলাম—কিছু সিদ্ধান্ত আমরা নিই না, আমাদের জন্য নেওয়া হয়।
আমি কিছু বলিনি।
কিছু বলার মতো ভাষা ছিল না।
আমার মনে হচ্ছিল—যে কথাটা আমি এতদিন বলিনি, সেটাই আজ আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ।
যদি বলতাম?
যদি একবার বলতাম—“আমি তোমাকে ভালোবাসি”?
তাহলে কি কিছু বদলাত?
হয়তো না।
কিন্তু অন্তত এই আফসোসটা থাকত না।
সেদিন বাড়ি ফিরে আমি প্রথমবার নিজের কাছে স্বীকার করলাম—
আমি নিপাকে ভালোবাসি।
ভীষণভাবে ভালোবাসি।
এতটাই, যে ওকে ছাড়া আমার নিজের অস্তিত্বটাও অসম্পূর্ণ মনে হয়।
কিন্তু সেই ভালোবাসা এখন অর্থহীন।
কারণ ও আর আমার না।
হয়তো কোনোদিনই ছিল না।
রাতে ঘুম আসছিল না।
আমি বারবার চোখ বন্ধ করছিলাম, আর নিপার মুখটা ভেসে উঠছিল।
ওর হাসি, ওর চোখ, ওর সেই মৃদু কথা বলা—সবকিছু।
আমার বুকের ভেতরটা কেমন জ্বালা করছিল।
এটা কি ভালোবাসা?
নাকি এটা একটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া বিষ?
আমি বুঝতে পারছিলাম না।
শুধু এতটুকু বুঝছিলাম—আমি বেঁচে আছি, কিন্তু ভেতর থেকে একটু একটু করে মরে যাচ্ছি।
মানুষ বলে—সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়।
কিন্তু আমি জানি—কিছু অনুভূতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না।
বরং আরও গভীরে গেঁথে যায়।
নিপা আমার জীবনের সেই অনুভূতি—
যাকে আমি কখনো পুরোপুরি পেয়েও পাইনি, আবার হারিয়েও হারাইনি।
আজও যখন নিজের শিরায় রক্ত চলাচল অনুভব করি, মনে হয়—
সেখানে নিপার নাম লেখা আছে।
একটা নাম, যা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।
আবার সেই নামই আমাকে প্রতিদিন একটু একটু করে শেষ করে দেয়।
(চলবে…)