ঢাকা, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০২:১১:২৮ AM

৫ আগস্টের নেপথ্যের নেতৃত্বে তারেক রহমান

মান্নান মারুফ
11-01-2026 07:10:56 PM
৫ আগস্টের নেপথ্যের নেতৃত্বে তারেক রহমান

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। দীর্ঘ ১৭ বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলন, ধারাবাহিক দমন–পীড়ন, গুম, খুন, কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্য দিয়ে যে গণঅসন্তোষ ধীরে ধীরে দানা বাঁধে, তা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক বিস্ফোরক গণঅভ্যুত্থানে। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পেছনে যাঁর নাম বারবার আলোচিত হচ্ছে, তিনি হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান কেবল একজন নির্বাসিত রাজনৈতিক নেতা নন; বরং তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কৌশলবিদ ও সমন্বয়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। অনেকের কাছেই এই বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, আবার অনেকেই হয়তো তা জানলেও প্রকাশ্যে স্বীকার করতে অনাগ্রহী।

লন্ডনে নির্বাসন, কিন্তু রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে

রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডনে যাওয়ার পর তারেক রহমান ধীরে ধীরে শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে দেশ থেকে দূরে অবস্থান করলেও তিনি কখনোই রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। বরং লন্ডনে অবস্থানকালেই তিনি গড়ে তোলেন একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাগত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী, নাট্যকার, সাংবাদিক, কবি, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে—এমন বহু মানুষের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এসব যোগাযোগ কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ বা মতবিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনমত, সামাজিক মনোভাব এবং প্রশাসনিক গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করত।

বিশ্লেষকদের মতে, লন্ডনে অবস্থান করেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত থাকার এই সক্ষমতাই তারেক রহমানকে অন্য অনেক নির্বাসিত নেতার থেকে আলাদা করেছে।

তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থা

২০১৩ সাল থেকে তারেক রহমানের রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে। তিনি কেবল দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং জেলা, থানা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যোগাযোগ বজায় রাখেন।

বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন, তৃণমূল নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাই এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা জানার ক্ষেত্রে এই যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একাধিক সূত্র জানায়, তারেক রহমান প্রতিদিন একাধিকবার বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে কী ঘটছে, কোথায় আন্দোলন জোরালো হচ্ছে, কোথায় দুর্বলতা রয়েছে—সেসব তথ্য সংগ্রহ করতেন।

আন্দোলনের গতি–প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে তিনি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতেন, যা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের পরিস্থিতি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য শক্তি ছিল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা রাখা। তিনি শুধু প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতেন না, বরং অনেক কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্য নিজেরাই তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।

কে কোথায় বদলি হচ্ছেন, কোন কর্মকর্তা কী ধরনের ভূমিকা পালন করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ বা দ্বিধা কোথায়—এসব তথ্য আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্দোলনের সময় কোন এলাকায় কতটা চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব, কোথায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি কার্যকর হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই তথ্যগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হতো।

আন্দোলনের কৌশল: পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক সংগ্রাম

তারেক রহমান আন্দোলনের খবর শুধু সংগ্রহ করতেন না; বরং আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন। কোন সমাবেশ কবে হবে, কোথায় হবে, তার আগে কীভাবে লিফলেট বিতরণ করা হবে, কোন বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি—এসব বিষয় ছিল তার নখদর্পণে।

আন্দোলনের ধরন কী হবে—শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি, প্রতীকী প্রতিবাদ নাকি ধাপে ধাপে কঠোর আন্দোলন—সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা হতো। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সুসংগঠিত ও ধৈর্যনির্ভর কৌশলই দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে।

১৭ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতা

২০০৯ সালের পর থেকে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি যে ভয়াবহ দমন–পীড়নের মুখে পড়ে, তার প্রেক্ষাপটে আন্দোলন টিকিয়ে রাখা ছিল অত্যন্ত কঠিন। গুম, খুন, গ্রেপ্তার, মামলা, কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্য দিয়েও নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেন।

এই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পেছনে তারেক রহমানের রাজনৈতিক বার্তা ও নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বারবার আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে ধৈর্য, সংগঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের কথা বলেন। তার কৌশল ছিল আবেগনির্ভর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে দেওয়া।

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান: নেপথ্যের বাস্তবতা

৫ আগস্টের আন্দোলনে তারেক রহমান সরাসরি মাঠে উপস্থিত ছিলেন না—এটি সত্য। কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের একটি বড় অংশই স্বীকার করেন, এই আন্দোলনের পেছনের পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনায় তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

ছাত্র নেতৃত্বের পাশাপাশি অন্য দলের ছাত্র, যুবক, শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং সাধারণ জনগণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী শ্রেণিকে এক ছাতার নিচে আনার কৌশলটি আন্দোলনের বিস্তারে বিশেষ অবদান রাখে।

একাধিক সূত্র জানায়, দলের ছাত্রনেতাদের মধ্যে কে কোথায় দায়িত্ব পালন করবেন, কোন এলাকায় কীভাবে আন্দোলন জোরদার হবে—এসব নির্দেশনাও তারেক রহমান দিয়েছেন।

শেখ হাসিনার পতনের প্রেক্ষাপট

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৩৬ জুলাইয়ের অভ্যুত্থান কিংবা ৫ আগস্টের সরকার পতন বা প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগের প্রেক্ষাপট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এটি ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত আন্দোলনের ফলাফল, যার সূচনা হয়েছিল অনেক আগেই।

এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তারেক রহমান ছিলেন অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি। তিনি হয়তো দৃশ্যমান মঞ্চে ছিলেন না, কিন্তু নেপথ্যে থেকে আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণে তার ভূমিকা ছিল নির্ধারক।

ইতিহাসে তারেক রহমানের অবস্থান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু আন্দোলন হয়েছে, বহু নেতাই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। তিনি ছিলেন একজন নীরব কৌশলবিদ, যিনি দূরে থেকেও মাঠের প্রতিটি চাল পর্যবেক্ষণ করেছেন।

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং তার আগের ১৭ বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—এই সংগ্রামের নেপথ্যের নায়ক হিসেবে তারেক রহমানের ভূমিকা ভবিষ্যতে ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হবে। এক পর্যায়ে ছাত্র–জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়, যার পেছনে দীর্ঘদিনের সংগঠিত রাজনৈতিক প্রচেষ্টা কাজ করেছে।

রাজনীতির মঞ্চে তিনি প্রকাশ্যে থাকুন বা না থাকুন, শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে তারেক রহমান যে একটি কেন্দ্রীয় ও নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ খুব কমই রয়েছে। ইতোমধ্যেই আন্দোলনের সময় নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সমন্বয়কেরা বিভিন্ন সভা–সমাবেশে তারেক রহমানের আন্দোলন–সম্পৃক্ত অবদানের কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছেন।