পর্ব ২: প্রথম পরিচয়
ক্যাফের ভেতরের বাতাসে কফির গরম বাষ্প আর হালকা সঙ্গীতের মৃদু মিশ্রণ। একটি ছোট টেবিলের পাশে কুদ্দুছ ল্যাপটপ খুলে কাজ করছিল। তবে আজ তার মন অন্যত্র—কিছুক্ষণ আগে যে চোখে চোখ মিলেছিল, সেই মেয়েটির দিকেই।
হঠাৎ দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল। হাতে কফির কাপ নিয়ে সে ভেতরে ঢুকল। কুদ্দুছের হৃদয় অজান্তেই দ্রুত ধড়ফড় করতে লাগল।
“হ্যালো,” মেয়েটি ধীরে বলল, “আমি আজ নতুন। এখানে আগে কখনও আসিনি। তুমি কি একটু সাহায্য করতে পারবে?”
কুদ্দুছ হালকা হাসল, নিজের ভেতরের অস্বস্তি আড়াল করার চেষ্টা করে।
“অবশ্যই। তুমি কফি নেবে, না চা?”
“কফি। তবে একটু ভিন্ন কিছু—এই শহরের নতুন কোনো স্বাদ আমি চেষ্টা করতে চাই।” কৌতূহলী চোখে সে তাকাল।
কুদ্দুছ মৃদু মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে, আমি তোমার জন্য সাজেস্ট করব। তুমি এখানে নতুন? একা?”
“হ্যাঁ। নতুন শহর, নতুন জীবন। সবাই ব্যস্ত—আর আমি শুধু আমি।” তার চোখে ভেসে উঠল এক অজানা শূন্যতা।
কুদ্দুছ বুঝতে চাইল—সে কি ভয় পেয়েছে, নাকি কৌতূহলই তার মনে ঢেউ তুলছে।
“তোমার নাম কী?”
“অ্যামেলিয়া।”
শব্দটি যেন কফির গরম বাষ্পের মতো বাতাসে ভেসে রইল।
কুদ্দুছের চোখে হালকা আলোর ঝিলিক।
“আমি কুদ্দুছ।”
মুহূর্তটি ক্ষণিকের, তবু দু’জনের কাছে সময় যেন থমকে গেল।
“তুমি কি এই শহরটাকে ভালো চেনো?” অ্যামেলিয়া জিজ্ঞেস করল—যেন নিজের একাকীত্বের শূন্যতা ভরাতে চাইছে।
কুদ্দুছ হাসল।
“ল্যান্ডমার্কগুলো চিনি। তবে তার চেয়েও বেশি চিনি শহরের গল্প—এর মানুষ, রাস্তা, ক্যাফে—সবই।”
অ্যামেলিয়া আগ্রহী হয়ে উঠল।
“তাহলে আমাকে দেখাবে? শহরটা তোমার চোখে কেমন?”
“হয়তো একদিন। তবে আজ কফি দিয়েই শুরু করা যাক।”
কফি এলো। ল্যাটের উষ্ণ কাপ হাতে নিয়ে তারা আড্ডায় বসল।
“ঢাকার কথা বলো,” অ্যামেলিয়া বলল, “সেখানে জীবন কেমন?”
কুদ্দুছ হালকা হাসল। চোখের আড়ালে ভেসে উঠল কিছু স্মৃতি।
“ঢাকা বিশাল, কোলাহলপূর্ণ। বর্ষায় রাস্তায় পানি জমে যায়। ভ্যাপসা গরম, নানা গন্ধ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত রঙের শহর।”
অ্যামেলিয়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল।
“আমি কখনও এমন কিছু দেখিনি। সবকিছুই যেন একেবারে ভিন্ন।”
কুদ্দুছের কণ্ঠ নরম হয়ে এল।
“তোমার মতো কেউ দেখলে হয়তো কোলাহল শুনবে না—শুধু গল্পটাই শুনবে।”
অ্যামেলিয়া হালকা হেসে বলল,
“আমি শুনতে চাই। বলো, তুমি কী দেখেছ?”
কুদ্দুছের মনে ঢেউ খেলাল স্মৃতিরা—গ্রামের মেঠো পথ, বর্ষার গন্ধ, ভেজা মাটির ঘ্রাণ, ছোট ছোট আনন্দ।
“বিশ্বাস করবে না,” কুদ্দুছ বলল,
“কীভাবে মানুষ ছোট ছোট জিনিসেই সুখ খুঁজে পায়—নদীর ধারে বসে থাকা, এক বাটি ভাত, কিংবা সূর্যাস্ত দেখার মুহূর্তে।”
অ্যামেলিয়ার চোখে আগ্রহ আরও গভীর হলো।
“আর আমি? আমি কি সেই ছোট সুখ বুঝতে পারব?”
কুদ্দুছের চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“হয়তো। তবে আগে জানতে হবে—তুমি কি সত্যিই শোনার মতো মানুষ?”
অ্যামেলিয়া গম্ভীর স্বরে বলল,
“হ্যাঁ। আমি শুনতে চাই। আমি বুঝতে চাই।”
দু’জনের চোখে তৈরি হলো এক অদ্ভুত মিল। কফির গরম বাষ্প যেন ধীরে ধীরে তাদের মাঝের দূরত্ব মুছে দিল।
হঠাৎ অ্যামেলিয়া বলল,
“জানো, আমার জীবনে সবকিছুই ছিল—পরিকল্পনা, ধন, আভিজাত্য। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ছিল এক গভীর একাকীত্ব।”
কুদ্দুছের হৃদয় কেঁপে উঠল।
“আমি বুঝি। আমি এখানে এসেছি স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু কখনও ভাবিনি—এভাবে কারও চোখে চোখ রেখে নিজের গল্প বলব।”
মুহূর্তটি দীর্ঘ হয়ে গেল। শব্দের আর প্রয়োজন রইল না। কফির উষ্ণতা, ক্যাফের নরম আলো, চারপাশের অস্পষ্ট কোলাহল—সব মিলিয়ে তৈরি হলো এক অনন্য অনুভূতি।
অ্যামেলিয়া হেসে বলল,
“তুমি কি কখনও ভেবেছ—মানুষ শুধু গল্প শোনে না, গল্পের ভেতর দিয়ে অনুভবও করে?”
কুদ্দুছ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
“হ্যাঁ। আর সেই অনুভূতিই সবচেয়ে মূল্যবান।”
কফি শেষ হলে অ্যামেলিয়া বলল,
“তুমি কি আমাকে আবার দেখাবে? ঢাকার গল্প শোনাবে?”
কুদ্দুছ কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল,
“আমি চাই। তবে জানি না কখন।”
অ্যামেলিয়ার চোখে ঝিলিক।
“যদি তুমি চাও, সময় আমরা বের করব। সময় সবসময় আসে। আর যদি না আসে?”
কুদ্দুছ হালকা হেসে বলল,
“তাহলে আমরা নিজেরাই সময় বানাব।”
ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় তারা আলিঙ্গন করল না। তবু দু’জনের হৃদয়ে তৈরি হয়ে গেল এক অদৃশ্য বন্ধন।
সিডনির রোদে ভরা ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে কুদ্দুছ একটুকরো শান্তি অনুভব করল। ভিসার অনিশ্চয়তা, পড়াশোনার চাপ, জীবনের নানা সমস্যা সত্ত্বেও আজ তার মনে হলো—কখনও কখনও একটি মানুষ, একটি গল্পই জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।
চলবে…