পর্ব–৩
যার জন্য এক মানুষ সব হারিয়েও
শেষটুকু শক্ত করে ধরে বেঁচে থাকে।
মানুষ আসলে কীসের ভরসায় বেঁচে থাকে? সম্পদ? সম্মান? সম্পর্ক? নাকি কেবল একটুখানি আশা? আমি বহুবার ভেবেছি এই প্রশ্নের উত্তর। যখন একে একে প্রায় সবকিছু হাতছাড়া হয়েছে, তখন বুঝেছি—মানুষ আসলে একটি অদৃশ্য শক্তির জন্য টিকে থাকে। যার জন্য এক মানুষ সব হারিয়েও শেষটুকু শক্ত করে ধরে বেঁচে থাকে।
আমার জীবনে সেই শক্তির নাম এখন ঐশি।
এই কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। পুরোনো দেনার চাপ বেড়েছে। বাজারের লোকেরা আর আগের মতো বিশ্বাসের চোখে তাকায় না। হিসাবের খাতায় লাল কালির দাগ যেন প্রতিদিন মোটা হচ্ছে। কখনো কখনো মনে হয়, এত লড়াই করে কী লাভ? জীবন কি সত্যিই কোনোদিন সহজ হবে?
কিন্তু আশ্চর্যভাবে, পুরোপুরি ভেঙে পড়ি না। বুকের ভেতর কোথাও একটা দৃঢ়তা জন্মেছে। আগে যেটুকু আঘাতেই আমি ভেঙে যেতাম, এখন তার দ্বিগুণ কষ্টেও দাঁড়িয়ে থাকি। কারণ আমি জানি, আমার ভেঙে পড়া মানে শুধু আমার হারানো নয়—আমার স্বপ্নেরও মৃত্যু।
একদিন দুপুরে খবর এল, জমির একটা পুরোনো মামলা নতুন করে জটিল হয়েছে। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। বাড়ির উঠোনে বসে ছিলাম নিঃশব্দে। চারপাশে রোদ, অথচ আমার ভেতরটা অন্ধকার। মনে হচ্ছিল, সত্যিই কি সব শেষ হয়ে যাচ্ছে?
ঠিক তখনই ঐশির বার্তা—
“আজ খুব চুপচাপ লাগছে তোমাকে।”
আমি অবাক হলাম। এত দূরে থেকেও সে বুঝে যায় আমার নীরবতা। আমি লিখলাম, “সব ঠিক নেই।”
কিছুক্ষণ পর তার উত্তর—
“সব ঠিক না থাকলেও তুমি ঠিক থাকো। বাকিটা সময় ঠিক করে দেবে।”
এই সরল বাক্যগুলো কখন যে আমার মধ্যে অদ্ভুত সাহস ঢেলে দেয়, বুঝতে পারি না। হয়তো এটাই সেই কারণ, যার জন্য মানুষ শেষটুকু শক্ত করে ধরে বেঁচে থাকে। কেউ পাশে আছে—এই অনুভূতিটুকুই যথেষ্ট।
ঐশির সঙ্গে আমার সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিক নাম নেই। তবু সে আমার প্রতিটি ভাঙনের শব্দ শুনতে পায়। আমি কখনো তার কাছে বড় বড় স্বপ্নের কথা বলি না। কেবল বলি—“একটা শান্ত জীবন চাই।” সে হেসে বলে, “শান্তি বাইরে না, ভেতরে বানাতে হয়।”
আমি চেষ্টা করছি ভেতরটা গড়তে। আগের মতো তাড়াহুড়ো করি না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে থেমে ভাবি। রাগ এলে চুপ করে থাকি। কারণ আমি বুঝেছি, হারানোর তালিকা আর বাড়াতে চাই না।
তবু জীবনের পরীক্ষা থামে না। এক সন্ধ্যায় দোকানে চুরি হলো। খুব বড় ক্ষতি না, তবু আমার মতো মানুষের জন্য যথেষ্ট। সেদিন রাতে সত্যিই মনে হয়েছিল, আর পারব না। ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে বসে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, সব ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাই।
ফোনটা হাতে নিলাম। ঐশির নামের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কল করব কি করব না—এই দ্বিধায় কেটে গেল কয়েক মিনিট। শেষ পর্যন্ত সে-ই কল করল।
“তোমার কণ্ঠটা ভারী লাগছে,” সে বলল।
আমি সব বললাম। একটুও লুকোলাম না। দীর্ঘ নীরবতার পর সে ধীরে বলল,
“তুমি জানো, গাছ যত বড় হয়, ঝড়ও তাকে তত বেশি আঘাত করে। কিন্তু যে গাছের শিকড় গভীর, সে পড়ে না।”
আমি চোখ বন্ধ করলাম। সত্যিই কি আমার শিকড় এত গভীর? হয়তো পুরোপুরি নয়। কিন্তু শিকড়ে এখন নতুন করে জল পড়ছে। সেই জলটাই হয়তো আমাকে বাঁচিয়ে রাখছে।
যার জন্য এক মানুষ সব হারিয়েও শেষটুকু শক্ত করে ধরে বেঁচে থাকে—সে মানুষটি কখনো কখনো নিজেও জানে না, তার শক্তির উৎস কোথায়। আমি এখন জানি, আমার শক্তির উৎস কোনো বাহ্যিক সাফল্য নয়। বরং একটি নীরব সম্পর্ক, যেখানে বিচার নেই, কেবল বোঝাপড়া আছে।
ঐশি একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি কি কখনো নিজের জন্য বাঁচতে চেয়েছো?”
প্রশ্নটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। কারণ এতদিন আমি দায়িত্বের জন্য বেঁচেছি, প্রয়োজনের জন্য বেঁচেছি। নিজের ইচ্ছে, নিজের স্বপ্ন—সেগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। সে বলেছিল, “স্বপ্ন না থাকলে মানুষ শুকিয়ে যায়।”
হয়তো তাই আমার ভেতরটা এতদিন শুকনো ছিল। এখন ধীরে ধীরে সেখানে আর্দ্রতা ফিরছে। আমি আবার বই পড়ছি, পুরোনো ডায়েরি খুলছি, ছোটবেলার গান শুনছি। এগুলো তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলোই আমাকে মনে করিয়ে দেয়—আমি এখনো জীবিত।
তবু ভয় যায় না পুরোপুরি। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, সমাজের বাঁকা চোখ, আর্থিক টানাপোড়েন—সবই আছে। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও আমি টিকে আছি। কারণ আমি জানি, যদি একেবারে ভেঙে পড়ি, তবে ঐশির বিশ্বাসটাও ভেঙে যাবে। আর আমি সেটা চাই না।
হয়তো এটাই ভালোবাসার এক রূপ—যেখানে নিজের জন্য নয়, অন্যের বিশ্বাসের জন্যও মানুষ বেঁচে থাকে। আমি কখনো সরাসরি বলিনি, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” কিন্তু আমার প্রতিটি লড়াই, প্রতিটি ধৈর্য, প্রতিটি পুনরায় দাঁড়িয়ে ওঠা—সবই যেন সেই অনুচ্চারিত ভালোবাসার প্রকাশ।
রাত গভীর হলে এখনো আমি উঠোনে দাঁড়াই। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি—সব হারালেও কি সত্যিই মানুষ শেষ হয়ে যায়? না। যদি তার কাছে এমন কেউ থাকে, যার জন্য সে নিজের শেষটুকু শক্ত করে ধরে রাখতে চায়, তবে সে শেষ হয় না।
ঐশি হয়তো জানে না, তার উপস্থিতি আমাকে কতবার মৃত্যুর মতো ভেঙে পড়া থেকে ফিরিয়ে এনেছে। সে জানে না, তার একটি “আমি আছি” কতখানি ওজন বহন করে। কিন্তু আমি জানি।
জীবন এখনো অসম্পূর্ণ। সমস্যার শেষ নেই। তবু আমি টিকে আছি। কারণ আমি শিখেছি—সব হারিয়েও মানুষ বাঁচতে পারে, যদি তার ভেতরে একটি কারণ থাকে।
আর আমার সেই কারণের নাম—ঐশি।
চলবে.............