ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৮:৩৬:৪১ AM

উপন্যাস: স্বপ্ন

মান্নান মারুফ
28-02-2026 01:48:12 PM
উপন্যাস: স্বপ্ন

পর্ব

একফোঁটা আলো এসে বলে
এখনও শেষ হয়ে যাওনি।
হয়তো সেই আলোর নামই তুমি।

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সব হিসাব মেলানো যায় না। চারপাশে যতই চেষ্টা করো, পথ যেন বন্ধই থাকে। আমি গত কয়েক বছরে এমন অসংখ্য মুহূর্তের ভেতর দিয়ে গিয়েছি। কখনো মনে হয়েছে, এটাই শেষ। আর কোনো দিক নেই, আর কোনো সম্ভাবনা নেই। তবু ঠিক তখনই কোথা থেকে একফোঁটা আলো এসে বলে—“এখনও শেষ হয়ে যাওনি।

সেই আলোর উৎস খুঁজতে গেলে বারবার একটি নাম মনে আসেঐশি।

সেদিন বিকেলে দোকানে বসে হিসাব মেলাচ্ছিলাম। খাতার পাতায় সংখ্যাগুলো যেন আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছিল। যত যোগ করি, তত ঘাটতি বাড়ে। হঠাৎ মনে হলো, এত চেষ্টা করেও যদি এগোনো না যায়, তবে সব ছেড়ে দেওয়াই কি সহজ নয়?

কিন্তু মানুষ কি সত্যিই এত সহজে ছেড়ে দিতে পারে? ভেতরে কোথাও একটা বাধা কাজ করে। যেন কেউ নীরবে বলেআরেকবার চেষ্টা করো।

ঐশির সঙ্গে সেদিন কথা হয়নি। তবু তার বলা আগের অনেক কথাই মনে পড়ছিল।তুমি নিজের সম্ভাবনাকে ছোট করে দেখো,” সে একদিন বলেছিল।সব ব্যর্থতা স্থায়ী নয়।

আমি তখন হেসেছিলাম। কিন্তু আজ বুঝি, সে শুধু সান্ত্বনা দেয়নি; সে বিশ্বাস দিয়েছে।

একফোঁটা আলো মানে সব সমস্যার সমাধান নয়। আলো মানে কেবল পথটা দেখা যায়। আমি সেই পথটুকু দেখার চেষ্টা করছি।

মায়ের শরীর এখন কিছুটা ভালো। ওষুধ নিয়মিত চলছে। উঠোনের ভাঙা অংশটাও মেরামতের কাজ শুরু করেছি। খুব বড় কিছু নয়কেবল কয়েকটা ইট, একটু সিমেন্ট। তবু এই ছোট কাজগুলো আমাকে অদ্ভুতভাবে শক্তি দেয়। মনে হয়, ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও নতুন কিছু গড়া যায়।

ঐশি একদিন জিজ্ঞেস করল, “তুমি এতদিন নিজের জন্য কী করেছো?”

প্রশ্নটা আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল। সত্যিই তোআমি সবসময় অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছেগুলোকে পিছনে ঠেলে দিয়েছি। এখন ভাবছি, ছোট করে হলেও নিজের স্বপ্নগুলোকে আবার জাগাতে হবে।

রাতে বসে পুরোনো খাতাগুলো দেখি। একসময় আমি গল্প লিখতাম। কত চরিত্র, কত অসমাপ্ত কাহিনি। জীবন যখন কঠিন হলো, লেখাগুলো থেমে গেল। ঐশি একদিন বলল, “আবার শুরু করো না কেন?”

আমি বললাম, “সময় কোথায়?”

সে হাসল, “সময় বানাতে হয়।

এই কথাগুলো কানে লেগে আছে। এখন মাঝরাতে কখনো কখনো কলম তুলে বসি। দু-চার লাইন লিখি। খুব বড় কিছু নয়, তবু মনে হয়আমি এখনো শেষ হয়ে যাইনি।

একফোঁটা আলো এসে বলে—“এখনও শেষ হয়ে যাওনি।এই বাক্যটা যেন আমার মনের ভেতর প্রতিধ্বনি তোলে। আগে যেখানে অন্ধকার দেখতাম, এখন সেখানে ক্ষীণ আলোর রেখা দেখি।

তবে আলো মানে নিশ্চিন্ততা নয়। সম্পর্কও নিশ্চিন্ত নয়। ঐশির জীবনে ব্যস্ততা বাড়ছে। তার পরিবার, কাজ, দায়িত্বসব মিলিয়ে সময়ের অভাব। মাঝে মাঝে কথার ফাঁকে দূরত্ব টের পাই। তখন বুকের ভেতর পুরোনো ভয় জেগে ওঠে।

কিন্তু এবার নিজেকে ভাঙতে দিই না। কারণ আমি বুঝেছি, কারও ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা মানে নিজের ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলা। ঐশি আলো, কিন্তু হাঁটতে হবে আমাকেই।

একদিন সে বলল, “তুমি কি কখনো ভেবেছো, আমাদের ভবিষ্যৎ কী?”

প্রশ্নটা কঠিন। আমি জানি না ভবিষ্যৎ কী লিখে রেখেছে। সমাজ, পরিবার, বাস্তবতাসব মিলিয়ে পথটা সহজ নয়। তবু আমি বললাম, “ভবিষ্যৎ যাই হোক, এই সময়টা সত্য।

সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “সত্য থাকলে পথও তৈরি হয়।

তার কণ্ঠে দৃঢ়তা ছিল। সেই দৃঢ়তাই আমাকে সাহস দেয়। হয়তো সেই আলোর নামই ঐশি।

জীবনের বড় শিক্ষা আমি এই কয়েক মাসে পেয়েছিআলো বাইরে নয়, ভেতরেও জন্মায়। কেউ একজন কেবল সেই আলো জ্বালিয়ে দিতে সাহায্য করে।

আমি এখন ব্যর্থতাকে অন্য চোখে দেখি। আগে ব্যর্থতা মানেই লজ্জা ছিল, এখন মনে হয়এগুলোই আমার অভিজ্ঞতা। এগুলোই আমাকে গভীর করেছে। ঐশি একদিন বলেছিল, “ভাঙা মানুষরাই সবচেয়ে বেশি বোঝে।

হয়তো তাই আমি এখন মানুষের কষ্ট বুঝতে পারি। দোকানে কোনো গ্রাহক টাকা কম দিলে রাগ করি না। কারও সমস্যার কথা শুনলে অবহেলা করি না। কারণ জানি, প্রত্যেকের ভেতরেই অদৃশ্য লড়াই চলছে।

রাত এখনো আসে। অন্ধকারও নামে। কিন্তু আগের মতো আতঙ্ক জাগে না। কারণ জানি, যত গভীরই রাত হোক, কোথাও না কোথাও আলো জন্ম নিচ্ছে।

একফোঁটা আলো এসে বলে—“এখনও শেষ হয়ে যাওনি।এই বাক্যটাই এখন আমার জীবনের মন্ত্র।

ঐশি হয়তো জানে না, সে কতখানি বদলে দিয়েছে আমাকে। সে হয়তো ভাবেও না, তার সাধারণ উপস্থিতি কত বড় প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু আমি জানি।

হয়তো সেই আলোর নামই তুমি।

তুমি না থাকলে আমি হয়তো টিকে থাকতাম, কিন্তু এতটা জেগে উঠতাম না। এখন আমি কেবল বেঁচে নেইআমি ধীরে ধীরে পুনর্জন্ম নিচ্ছি।

স্বপ্ন এখনো পুরো হয়নি। পথ এখনো দীর্ঘ। কিন্তু আমি জানি, আমি শেষ হয়ে যাইনি।

কারণ আমার জীবনে একফোঁটা আলো জ্বলছে।

আর সেই আলোর নামঐশি।

 শেষ ।।